তিস্তা মহাপরিকল্পনা: উত্তরবঙ্গের ভাগ্যবদল না ভূরাজনীতির নতুন কুরুক্ষেত্র?

হিমালয়ের বরফগলা জলধারা থেকে উৎপত্তি হয়ে যে নদীটি সিকিম আর পশ্চিমবঙ্গ ছুঁয়ে বাংলাদেশের উত্তর জনপদে প্রবেশ করেছে, তার নাম তিস্তা। এককালে এই নদীকে বলা হতো ‘উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা’। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে তিস্তা রূপ নিয়েছে দুঃখ, বঞ্চনা আর কান্নার অপর নাম। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ধূ ধূ মরুভূমি, আর বর্ষায় উজানের ঢলে সর্বগ্রাসী বন্যা—এই দুই চরম সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। এই মরণফাঁদ থেকে উত্তরবঙ্গকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকার হাতে নিয়েছে এক যুগান্তকারী ও চোখধাঁধানো রূপরেখা—‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’।

আপাতদৃষ্টে এটি একটি সাধারণ নদী শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প মনে হলেও, একে ঘিরে এখন এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর পরাশক্তি—চীন এবং ভারতের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধ।

কেন একটি নদী প্রকল্প ঘিরে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এত তোলপাড়? কী আছে এই মহাপরিকল্পনায় : বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো এক বাস্তব রূপরেখাতিস্তা মহাপরিকল্পনা হলো মূলত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট, যা চীনের ‘হোয়াংহো’ নদীর সফল ব্যবস্থাপনার আদলে তৈরি করা হয়েছে। ২০১৬ সালের একটি স্মারক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়।

এই মহাপরিকল্পনায় নদী শাসনের প্রথম ধাপ হিসেবে তিস্তা নদীর প্রায় ১০২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ড্রেজিং করা হবে। নদীর গভীরতা ১০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হবে, যাতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি নদী নিজের বুকেই ধরে রাখতে পারে। নদীর দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও শক্তিশালী গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর ফলে প্রতিবছরের চিরচেনা নদীভাঙন চিরতরে বন্ধ হবে। নদীকে একটি নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সীমানার মধ্যে এনে প্রায় ১৭১ বর্গকিলোমিটার চরভূমি (যা আগে নদীগর্ভে বিলীন ছিল) উদ্ধার করা হবে। উদ্ধার হওয়া এই বিশাল জমিতে গড়ে উঠবে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট শহর, পাঁচতারকা হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদন কেন্দ্র এবং মেরিন ড্রাইভ। এছাড়া থাকবে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট এবং অসংখ্য কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা।

কেন এই মহাপরিকল্পনা : বাংলাদেশে তিস্তার গতিপথ ১১৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার তীরভূমি চরম ক্ষয়প্রবণ।ক) শুষ্ক মৌসুমের মরুভূমি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকটশুষ্ক মৌসুমে ভারতের গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি আটকে রাখার ফলে তিস্তা বাংলাদেশ অংশে কঙ্কালসার হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IFPRI) মতে, পানির অভাবে এই অঞ্চলে বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় তীব্র পানির সংকট তৈরি হয়।খ) বর্ষার উন্মত্ততা ও অর্থনৈতিক ক্ষতিআবার বর্ষাকালে যখন ভারতে পানির চাপ বাড়ে, তখন গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট একসাথে খুলে দেওয়া হয়। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যায় লাখো মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষেত। প্রতিবছর এই বন্যার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৮৩ সালের অন্তর্বর্তী চুক্তি কিংবা ২০১১ সালের সমান ভাগের খসড়া চুক্তি—কোনোটিই পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে আলোর মুখ দেখেনি। এই স্থায়ী অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্ম।

চীনের আগ্রহ ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI): চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানি প্রায় ৩ বছর ধরে তিস্তা অববাহিকায় ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সমীক্ষা চালিয়েছে। চীন এই প্রকল্পের সিংহভাগ (প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা) ঋণ দিতে এবং কারিগরি সহায়তা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এর মাধ্যমে চীন মূলত তাদের বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোরে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চায়।

ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ: ‘চিকেনস নেক’ আতঙ্কচীন যখনই টাকা নিয়ে প্রস্তুত, তখনই তীব্র আপত্তি তোলে নয়াদিল্লি। কারণ, তিস্তা প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছে। মাত্র ২১ থেকে ২৫ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টার্স) যুক্ত করেছে। ভারত ভয় পাচ্ছে, চীন যদি তিস্তা প্রজেক্টের উসিলায় উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে এসে বছরের পর বছর অবস্থান করে এবং ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করে, তবে যুদ্ধ বা যেকোনো সংকটের সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই চীনকে হঠাতে ২০২৪ সালে ভারত পাল্টা প্রস্তাব দেয়—”চীনের দরকার নেই, তিস্তা প্রকল্পের টাকা এবং কাজ আমরাই করব।

বর্তমান সরকারের দৃঢ় অবস্থান: দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে এসে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এক নতুন গতি পেয়েছে। সম্প্রতি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই প্রকল্পকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা: “দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। একই সাথে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংসদে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে তিস্তা এবং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে এবং চীন ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরেই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা অন্য যেকোনো নামেই হোক, এর দৃশ্যমান কাজ শুরু করতে বদ্ধপরিকর। সরকারের লক্ষ্য—আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন করা, যার একটি বড় অংশজুড়ে থাকবে তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।

বাস্তবায়িত হলে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে: যদি এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে আলোর মুখ দেখে, তবে উত্তরবঙ্গের মানচিত্র চিরতরে বদলে যাবে। সেচব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সচলতা তৈরি হবে। শিল্প ও কর্মসংস্থাননদীর দুই তীরে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অর্থনৈতিক অঞ্চলে লজিস্টিক সেন্টার ও প্রসেসিং জোন গড়ে উঠবে। এতে প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান হবে, কাজের জন্য আর ঢাকা বা অন্য শহরে ছুটতে হবে না। পর্যটন ও বিনোদনইকো-পার্ক, নদীকেন্দ্রিক রিসোর্ট, পাঁচতারকা হোটেল এবং মেরিন ড্রাইভের কারণে উত্তরবঙ্গ পরিণত হবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মূল আকর্ষণীয় কেন্দ্রে।

মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা: প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ পারিবারিক সম্পদ নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। তিস্তাপাড়ের ২ কোটি মানুষ ফিরে পাবে মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই।

পানিহীন নদীতে মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ কী? তিস্তা আজ শুধু একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার এক এসিড টেস্ট। তবে নদী বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মৌলিক সত্যকে এড়িয়ে এই মহাপরিকল্পনা সফল করা অসম্ভব—সেটি হলো পানির ন্যায্য হিস্যা। নদীতে যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিই না থাকে, তবে নদীর বুকে চোখধাঁধানো স্যাটেলাইট শহর বা বিশাল ব্যারাজ তৈরি করে লাভ কী? তাই বেইজিং বা নয়াদিল্লির ঋণের অঙ্কের চেয়েও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভারতের কাছ থেকে শুষ্ক মৌসুমের পানির হিস্যা আদায় করা। তবে বিষয়টি এখন শুধু বাংলাদেশের ন্যায্য পানির চাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। কারণ, তিস্তার ওপারে ভারত। তিস্তার উজানের অংশ আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে। সেখানেও চীনের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা আছে। মনে করা হয়, তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহের বড় কারণ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প। যার মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশকে একীভূত করতে চায়। তাই তিস্তা প্রকল্প ঘিরে ভূরাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশের বিষয় রয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এ বিষয়ে বলেছেন, তিস্তা নদীর সঙ্গে ভারত, চীনসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নদীপ্রবাহ জড়িত। আমরা কতটুকু পানি পাব, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলে প্রকল্প জটিল হয়ে যাবে। তাই ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি হতে হবে। নদীর উজানে চীনের নিয়ন্ত্রণ। তাই ভারতও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এ বিষয়ে বহুপাক্ষিকভাবে আলোচনা করা যায়।

তবে আশার কথা হলো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিস্তা পানি চুক্তি নিয়ে এক নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। ঢাকার দক্ষ কূটনীতি যদি বেইজিংয়ের কারিগরি সক্ষমতা এবং নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবেই তিস্তার প্রতিটি ঢেউয়ে বয়ে চলবে উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের স্বপ্ন। উত্তরের আকাশে তখন সত্যিই উদিত হবে এক নতুন আশার সূর্য।

জনপ্রশাসন/কেএ/২৯/০৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *