আনোয়ার হাকিম: ধনী- গরীব নির্বিশেষে আমাদের সবার ঘরেই একখানা আয়না অবশ্যই আছে। সে আয়নায় আমরা প্রতিদিন নিজ নিজ সুরত দেখি, একমনে তাকিয়ে থেকে অনেক কিছু ভাবি, গুনগুন করি আবার মনের অজান্তেই হেসে উঠি। খুব বেশি কদর্য না হলে নিজ চেহারার শান নিয়ে চিন্তা করি, সুখ পাই বা পাওয়ার চেষ্টা করি। আর চেহারা মলিন ও কমজোরি মনে হলে ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চটজলদি আয়না থেকে নিজেকে সরিয়ে নেই।
দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিকরা ভাবের জগতের লোক। অনেকটাই দিব্যদর্শী টাইপের। তারা একই আয়নাকে তাদের সৃষ্টিকর্মে, আপ্ত বাক্যে, গূঢ় দর্শনে ভিন্নরূপে বর্ণনা করে থাকেন। সে আয়না নিছক সিলিকন আর পারদের সংমিশ্রণে সৃষ্ট সাধারণ কোনো আয়না না। এরূপ আয়না অন্তরের, বিবেকের, সত্যমিথ্যা সনাক্তকরণের অদ্ভুত এক আয়না। তাই, সাজগোজ করার আয়না আর মনোরূপ প্রতিফলিত হওয়ার আয়না এক না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা কমবেশি সবাই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এই দুই আয়নারই মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিদিন।
প্রযুক্তির উন্নয়নে আজকাল আয়নার আকার-আকৃতি ও গ্ল্যামারে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আয়নাকে কেউ দামী ও বাহারি কারুকাজ করা ফ্রেমে আবদ্ধ করছে, কেউ তার চারপাশে লাইটের ঔজ্জ্বল্য বাড়াচ্ছে। মোবাইলের ক্যামেরার মত ফিল্টারও যোগ করছে কিনা জানা নেই।
চশমার দোকানে, বিপনি বিতানে, ফাইভ স্টার হোটেলের রুমে বা লবিতে সেঁটে রাখা বড় আয়নায় নিজের মুখ দেখলেই কেমন যেন ভেতর থেকে সুখানুভূতির দীপ্তি ছড়াতে থাকে। কিন্তু সারাক্ষণ মনের মাঝে যে আয়না নিয়ে ঘুরি তা একটু সুযোগ পেলেই নানাবিধ অপকর্মের স্ক্রিনশট পাঠাতে থাকে আর ক্রমাগত ঘাঁই মেরে যন্ত্রণাক্লিষ্ট করে তোলে।
পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে আজ ফিল্টারযুক্ত আয়না চালু হয়ে গেছে। সেখানে আমরা যে যার আঙ্গিনায় এক এক জন সুশীল নায়ক। আমরা এতেই পরম তৃপ্ত ও চরম পুলকিত। তাই, যা কিছুই দেখি সুন্দর লাগে, যা কিছুই শুনি মধুর লাগে। এই তুষ্টি আমাদেরকে দৌড়াতে, টপকাতে, উপড়াতে, কুপোকাত করতে প্রণোদনা যুগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমরা তাই আরো বেগে, আরো জোশে দৌড়ানোর চেষ্টা করছি।
থাকুক না তাতে ভ্রান্তি। থাকুক না তাতে অন্যের রোদন কিংবা নি:শেষ হয়ে যাওয়ার কাহিনী। হয়ত অনেকেই ছি: ছি: করছে, করুক। তারা কি আমার অন্নের যোগান দেবে? ভল্টের শ্রীবৃদ্ধি করে দেবে? বরং স্বকৃত কর্মে, দিনশেষে, ফিল্টারযুক্ত আয়নায় নিজেকে কামিয়াবই মনে হয়। আমরা তো এরূপ আয়না-ই চাই।
সমাজে যারা নিন্দুক, হেবনট, পরশ্রীকাতর তারাই ফিল্টারযুক্ত এই আয়নার অসারতা খুঁজে বেড়ায়। তারা এই আয়নার সাথে বিবেকের আয়না সংযুক্ত করে দিতে চায়। সেখানে কেবলই দুষ্কর্ম, নোংরামি, প্রতারণা, জুলুম আর মোনাফেকির চিত্র ভেসে ওঠে। কখনো তা অসহ্য ঠেকে। হাত দিয়ে সপাটে নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করি। সরাতে পারি না। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেই অন্যত্র। আবারও ফিরে ফিরে আসে। একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। জেগে উঠে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এভাবেই ক্ষমতার দাপট, প্রভাব-প্রতিপত্তির লোলুপতা, প্রবৃত্তির তাড়না আর বিত্তবাসনার পাগলা ঘোড়া আমাদেরকে প্রতিনিয়ত মোহাচ্ছন্ন করে রাখছে। আপাতত এ থেকে ফেরার পথ জানা নেই।
আমরা আসলে একটা বাওরি বাতাসের মধ্যে পড়ে গেছি। এটি অবশ্যই অসুস্থ ও পচনশীল সমাজের লক্ষণ। এটি অবশ্যই আমাদের নিজেদের কামাই। এ থেকে পরিত্রাণ পথ আমাদের নিজেদেরকেই বের করতে হবে। উভয় আয়নার সামনে নির্ভয়ে দাঁড়াবার মত সক্ষমতা ও সাহস অর্জন করতে হবে। এতে দায় সবার। তাই, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্র কাঠামো, সরকার ও রাজনীতির ভেতর (আত্ম) শুদ্ধি জরুরি। অতএব, ফিল্টার লাগানো আয়নায় না দেখে বিবেকের আয়নায় নিজেকে দেখি প্রতিদিন, সূর্যোদয়ে ও সূর্যাস্তে। সবার সুবোধ জাগ্রত হোক। #
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
