জুলাইয়ে ডেঙ্গু দ্বিগুণ, আগস্টে চারগুণ হওয়ার শঙ্কা

মশা নিয়ন্ত্রণে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চলতি জুলাই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ জুনের তুলনায় দ্বিগুণ এবং আগস্টে তা তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এডিস মশার বিস্তার রোধে কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং বছরব্যাপী নজরদারির অভাব ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আবহাওয়ার বিরূপ আচরণকে দায়ী করা হলেও, কীটতত্ত্ববিদরা স্পষ্ট জানিয়েছেন—মশা নিধনে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যানে ভয়াবহতার ইঙ্গিত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে রীতিমতো উল্লম্ফন ঘটেছে। গেল মে মাস ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭১৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আর জুন মাসজুড়ে আক্রান্ত বেড়ে ৫ হাজার ৯২৪ জনে ঠেকেছে। এর মধ্যে মৃত্যু ঘটেছে ১৮ জনের। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে আট গুণেরও বেশি।

আগস্টের পূর্বাভাস: নজর এখন ঢাকার বাইরে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার আগামী দুই মাসকে ডেঙ্গু মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে এবার ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

অধ্যাপক বাশার বলেন, ‘আমাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, আগস্টে ব্যাপক আকারে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।’

সংক্রমণের এই সম্ভাব্য বিস্ফোরণ ঠেকাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে দেশের সব জেলা শহরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা নিধনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

অব্যবস্থাপনা ও আগাম সতর্কবার্তার অভাব
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ জিএম সাইফুর রহমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই অবনতির পেছনে উচ্চ আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতকে যেমন কারণ হিসেবে দেখছেন, তেমনি আঙুল তুলেছেন দুর্বল মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকেও।

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যর্থ হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এখনো মশার প্রজনন ও সংক্রমণ ক্লাস্টার সঠিকভাবে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা বা কোনো ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ (আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা) গড়ে তুলতে পারেনি। বর্তমানে যে সংক্রমণ বাড়ছে, এই পূর্বাভাস আমরা আগেই দিয়েছিলাম। কিন্তু কাজে পরিণত হয়নি।’

প্রতিরোধে করণীয়: বিজ্ঞানভিত্তিক নিধন জরুরি
শুধু লার্ভা ধ্বংস করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং সংক্রমিত পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন না করলে প্রাদুর্ভাবের শৃঙ্খল ভাঙা যাবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

১. হটস্পট ম্যানেজমেন্ট: যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, সেখানে অবিলম্বে ফগিং এবং আলট্রা-লো-ভলিউম (ULV) স্প্রে করতে হবে।
২. অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ: পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের জন্য কার্যকর অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা বাধ্যতামূলক।
৩. সচেতনতা ও সুরক্ষা: নাগরিকদের লম্বা হাতাওয়ালা পোশাক পরা, ভোরে ও বিকেলে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং মশারি বা মশার প্রতিরোধক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সাফ কথা—কর্তৃপক্ষ যদি অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, সঠিক কীটনাশক এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করে মাঠে না নামে, তবে এবারের বর্ষায় ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী রেখাকে কোনোভাবেই টেনে ধরা সম্ভব হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *