‘নীল গ্রহের ফুসফুস’ সংকটে, রেকর্ড তাপমাত্রায় বিপদের ঘণ্টা

আমাদের এই নীল গ্রহের ফুসফুস—মহাসাগরগুলো আজ এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। যে সমুদ্র অনন্তকাল ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা শুষে নিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই সমুদ্রের নিজেরই এখন ‘জ্বর’। ২০২৬ সালের জুন মাস বিশ্বজুড়ে মহাসাগরগুলোর ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে থাকল এক দহনকারী সময়ের—যার তাপমাত্রা পৌঁছেছে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এক আসন্ন বিপদের ঘণ্টা।

মহাসাগর জুড়ে তাপের দাপট: ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কোপার্নিকাস মেরিন সার্ভিস’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাস ধরে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। বিষয়টি কেবল কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পৃথিবীর প্রায় ৮২ শতাংশ মহাসাগর বর্তমানে ভয়াবহ ‘মেরিন হিটওয়েভ’ বা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কবলে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর, উত্তর আটলান্টিকের মধ্যাঞ্চল এবং নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগর যেন আগ্নেয়গিরির উত্তাপ নিয়ে ফুটছে।

‘এল নিনো’: প্রকৃতির এক নতুন সংকেত: এই ভয়াবহ পরিস্থিতির নেপথ্যে কাজ করছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা শক্তিশালী ‘এল নিনো’। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো সতর্ক করে বলেছেন, “আমরা এক অজানা ও বিপজ্জনক অধ্যায়ে পা রাখছি।” সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক আচরণ পৃথিবীজুড়ে আবহাওয়ার ভারসাম্য উল্টে দিচ্ছে। পেরুর বন্যা, আফ্রিকার খরা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার দাবানল—সবকিছুর পেছনেই এই সমুদ্রের তপ্ত নিঃশ্বাসের যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন উদ্বিগ্ন পৃথিবী: মহাসাগর আমাদের উৎপাদিত কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৯০ শতাংশ তাপ নিজের ভেতর ধারণ করে। কিন্তু সমুদ্রের এই সহনশীলতারও তো সীমা আছে। সমুদ্রের পানি যত উত্তপ্ত হচ্ছে, ততটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে ঘূর্ণিঝড়গুলো, যা উপকূলীয় জনপদগুলোর জন্য চরম হুমকি। এছাড়াও:

উচ্চতা বৃদ্ধি: পানি উত্তপ্ত হলে আয়তনে প্রসারিত হয়। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে তলিয়ে যেতে পারে বিশ্বের নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলো।

প্রবাল প্রাচীরের মৃত্যু: সমুদ্রের তাপমাত্রায় সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় প্রবাল প্রাচীরগুলো তাদের রঙ হারিয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছে (ব্লীচিং), যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য এক বিশাল বিপর্যয়।

আর্দ্রতার দাপট: গরম পানির বাষ্প বাতাসে মিশে ঘূর্ণিঝড় ও ভারী বৃষ্টির জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

প্রকৃতি সংকেত দিচ্ছে, আর তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মহাসাগরগুলোর এই আর্তনাদ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পৃথিবী তার নিজস্ব গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সামনে হয়তো আরও নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় আছি আমরা, কিন্তু সেই রেকর্ড ভাঙার মাশুল কি দিতে হবে এই পৃথিবীকে?

জনপ্রশাসন/কেএ/ জেডআরসি/ ১ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *