একদিনে চার ধর্ষকের ফাঁসির রায়, ন্যায়বিচারের নতুন মাইলফলক

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল।

রামিসা ট্র্যাজেডির পর অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির যে দাবি জোরালো হয়েছিল, সোমবার (৬ জুলাই) দেশের বিভিন্ন আদালতে ঘোষিত কয়েকটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় যেন সেই দাবিরই আইনি প্রতিফলন। একই দিনে একাধিক মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের মতো সর্বোচ্চ সাজা দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানগত চালচিত্র
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (যেমন: আইন ও সালিশ কেন্দ্র বা আসক এবং বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম) নিয়মিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। গত কয়েক বছরে প্রতি বছর গড়ে কয়েক শত শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিচিত জন, আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের দ্বারাই বেশিরভাগ শিশু এই পাশবিকতার শিকার হয়। অপরাধীদের দ্রুত বিচার না হওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছিল বলে সমাজবিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে আসছিলেন। তবে সাম্প্রতিক এই রায়গুলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে একটি শক্ত বার্তা দিচ্ছে।

জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণে ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড
জামালপুরের বকশীগঞ্জে রাতে এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ৭ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মো. রাশেদুর রহমান ওরফে পাপ্পু, মো. বিজু মিয়া, মো. বাদশা মিয়া, মো. জুয়েল মিয়া, মো. আশরাফুল ইসলাম, জসিম ও আছমত।

ইজিবাইক চালক ইদ্রিস আলীকে মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৫ মে রাতে শেরপুরের ঝগড়ারচর বাজার থেকে বকশীগঞ্জের ভাড়া বাসায় ফেরার পথে আসামিরা গৃহবধূকে তুলে নিয়ে একটি পরিত্যক্ত রান্নাঘরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। চার্জশিট জমার মাত্র ৮ মাসের মাথায় ৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এই দ্রুততম রায়টি ঘোষণা করা হয়।

খাগড়াছড়িতে ৭ বছরের শিশু ধর্ষণে একজনের মৃত্যুদণ্ড
খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় দ্বিতীয় শ্রেণির এক মাদ্রাসাছাত্রীকে (৭) ধর্ষণের দায়ে মো. শাহিন (৫৩) নামে একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শায়েলা শারমিন এই রায় দেন। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এটিই প্রথম রায় এবং ঘটনার মাত্র ১১ মাস ১৪ দিনের মাথায় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে ৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আদালত এই রায় প্রদান করেন, যা সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমাতে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

নোয়াখালীতে ৫ বছরের শিশু আসমা ধর্ষণ-হত্যায় চাচাতো ভাইয়ের ফাঁসি
নোয়াখালীর চাটখিলে পাঁচ বছরের শিশু আসমা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে তার চাচাতো ভাই শাহাদাত হোসেনকে (২৬) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা আকতার চার বছর দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।

২০২২ সালের ২৪ মার্চ শিশু আসমা নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাংক থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামি শাহাদাত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতেই সে অবুঝ শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর আসামির ফাঁসির দাবিতে সেসময় নোয়াখালীজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল।

গোপালগঞ্জে স্কুলছাত্রী ধর্ষণে দুজনের যাবজ্জীবন
গোপালগঞ্জে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের মামলায় প্রধান আসামি উজ্জ্বল বিশ্বাসকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম। একই সঙ্গে ধর্ষণের কাজে সহায়তার জন্য দ্বিতীয় আসামি কল্পনা বিশ্বাসকেও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ২০২০ সালের ৩ অক্টোবর তালের পিঠা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীকে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এই রায় দেওয়া হয়।

শিশু রামিসার মর্মান্তিক পরিণতি দেশের মানুষের বিবেকে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, আজকের এই রায়গুলো সেই ক্ষতে কিছুটা হলেও প্রলেপ দিতে সক্ষম হয়েছে। জামালপুর, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী এবং গোপালগঞ্জের আদালত থেকে আসা এই রায়গুলো প্রমাণ করে যে, আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততর করা গেলে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।

এই মাইলফলক রায়গুলো ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে যেমন ন্যায়বিচার এনে দিয়েছে, তেমনি দেশের প্রতিটি নারী ও শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার পথে বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থানের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *