কারখানায় এখন আর ক্লান্তিহীন মানুষের হাতের ছোঁয়া নয়, বরং একটি বোতামের ক্লিকেই তৈরি হচ্ছে নিখুঁত পোশাক। মালিকপক্ষের কাছে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘প্রগতি’ বা ‘উন্নয়ন’। কিন্তু পর্দার আড়ালে এই প্রগতির জয়গান শুনছে না লাখ লাখ পোশাকশ্রমিক। তাদের কাছে এই যান্ত্রিক বিপ্লবের অর্থ একটাই—নিশ্চয়তাহীন ভবিষ্যৎ আর আসন্ন বেকারত্ব। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে অটোমেশন এখন আর কোনো দূরবর্তী শঙ্কা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা।
তথ্য ও পরিসংখ্যান: বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (BLF), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, পোশাক শিল্পে প্রযুক্তির আগ্রাসনে এরই মধ্যে কর্মীবাহিনীর ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বিলুপ্ত হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন নিম্নস্তরের ‘হেল্পার’ পদমর্যাদার কর্মীরা।
বিভাগের চিত্র: সোয়েটার উৎপাদনে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের হার ৩৭ শতাংশের বেশি, ওভেন গার্মেন্টসে প্রায় ২৭ শতাংশ।
মালিকপক্ষের পরিকল্পনা: ‘লাইটক্যাসল পার্টনার্স’-এর মতে, প্রতি ১০ জন মালিকের মধ্যে ৮ জনই আগামী দুই বছরে অটোমেশনে নতুন বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। একটি স্ট্যান্ডার্ড কারখানায় ২,২৫০ জন শ্রমিকের জায়গায় ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে মাত্র ৫০০ জন। অর্থাৎ, প্রতি কারখানায় গড়ে প্রায় ১,৭৫০ জন শ্রমিক হারিয়ে ফেলবেন তাদের কর্মসংস্থান।
বিশ্ব প্রেক্ষাপট: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) দাবি করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে নিট ৭ কোটি ৮০ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হবে। কিন্তু এই নতুন কর্মসংস্থানের সিংহভাগই হলো এআই (AI) বিশেষজ্ঞ বা ডেটা অ্যানালিস্টের মতো উচ্চপ্রযুক্তিভিত্তিক পদ। প্রশ্ন থেকে যায়—প্রান্তিক পর্যায় থেকে আসা একজন শ্রমিক, যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব রয়েছে, তিনি কীভাবে রাতারাতি এই উচ্চ প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেবেন? সরকারের ‘এটুআই’ ও আইএলও (ILO)-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ বা ৫৩ লাখ ৮০ হাজার পোশাকশ্রমিক এই অটোমেশনের কারণে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কেন ‘রিস্কিলিং’ বা প্রশিক্ষণ ব্যর্থ হচ্ছে: প্রশিক্ষণের নামে যে কর্মপরিকল্পনা চলছে, তা বাস্তবে আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় বন্দি। ৬১টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্থাকে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ‘দায়িত্ব সবার, কিন্তু ব্যর্থতার দায় কারোরই নয়’। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য যে মৌলিক গাণিতিক বা ডিজিটাল জ্ঞানের প্রয়োজন, তা অনেক শ্রমিকের নেই। ফলে, মাঝসমুদ্রে ডুবন্ত মানুষকে সাঁতার শেখানোর মতো অবাস্তব পরিকল্পনা করে প্রশিক্ষণ চলছে।
আমাদের পথচলা: প্রয়োজন একটি সমন্বিত রূপান্তর কৌশল: যন্ত্রের অগ্রগতি ঠেকানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তবে সেই যন্ত্রের নিচে পিষ্ট হওয়া মানুষগুলোর জন্য দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রেরই।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কর্মমুখী ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর জোর দেওয়া। কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য শিল্প খাতকে উৎসাহিত করা। অন্ধভাবে পূর্ণ-অটোমেশনে না গিয়ে মানুষ ও যন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা।
প্রযুক্তির রথে চড়ে আমরা উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে চাই, কিন্তু সেই রথের চাকায় যদি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি—আমাদের পোশাকশ্রমিকরাই পিষ্ট হন, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না। আমাদের প্রয়োজন নতুন কাউন্সিল নয়, প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ও মানবিক ‘রূপান্তর কৌশল’, যা প্রযুক্তি এবং মানুষ—উভয়কেই সমান্তরালে এগিয়ে নেবে।
জনপ্রশাসন/কেএ/ ০৮ জুলাই ২০২৬
