চীনের করিডোর: বাংলাদেশ উন্নয়নের স্বর্ণদ্বারে নাকি অদৃশ্য ফাঁদে?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বঙ্গোপসাগর এখন বড় শক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চীন যখন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের’ (BRI) অধীনে নতুন নতুন পথ খুঁজছে, ঠিক তখনই সামনে এলো ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের’ (CMBC) প্রস্তাব।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর এই করিডোর নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা যেমন বাংলাদেশে উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী করছে, তেমনি তৈরি করেছে নিরাপত্তার গভীর শঙ্কা। আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণে বাংলাদেশ কি কেবল একটি সেতু হয়ে থাকবে, নাকি এই খেলার অংশীদার হতে গিয়ে পড়বে কোনো অদৃশ্য ফাঁদে?

প্রকল্পের খুঁটিনাটি: কী চায় চীন: বেইজিংয়ের প্রস্তাবিত এই করিডোর কেবল রাস্তা বা রেলপথের নেটওয়ার্ক নয়, এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদী ‘স্ট্র্যাটেজিক ডকট্রিন’। বেইজিং চায় ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে রাখাইন রাজ্য অতিক্রম করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত মোংলা বন্দর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।

এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দুটি:

১. বাণিজ্যিক পথ: মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের অত্যধিক নির্ভরশীলতা কমানো। বর্তমানে চীনের সিংহভাগ জ্বালানি এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আসে। কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়তে পারে।
২. নৌ-প্রভাব: বঙ্গোপসাগরের সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়ার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ও বাণিজ্যিক আধিপত্য সুসংহত করা।

অর্থনৈতিক প্রলোভন ও সম্ভাবনা: বাংলাদেশের জন্য এই করিডোরকে অনেকেই দেখছেন একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে। ঢাকার নীতিনির্ধারকদের সামনে যে বিষয়গুলো আশার আলো দেখাচ্ছে:

ট্রানজিট হাবে রূপান্তর: বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় তার বন্দরগুলোকে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে পরিণত করতে চায়। চীনের বিনিয়োগ এই লক্ষ্য অর্জনে গতি আনতে পারে।

শিল্পায়নের গতি: চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাশে ৮০০ একর জমিতে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা চীনা শিল্পপার্ক বাংলাদেশের রফতানি খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

ব্যয় হ্রাস: স্থলপথে চীনের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হলে আমদানিকৃত কাঁচামালের খরচ কমবে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।

ভারতের ‘নিরাপত্তা উদ্বেগ’ ও আঞ্চলিক অস্বস্তি: ভারতের কাছে এই করিডোর কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি তার দক্ষিণদিকের নিরাপত্তা সীমানায় একটি ‘কৌশলগত বেষ্টনী’।

ভারতের বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ভূখণ্ড ব্যবহার করে চীন যদি বঙ্গোপসাগরে স্থায়ী ঘাঁটি বা শক্তিশালী লজিস্টিক সাপোর্ট তৈরি করতে পারে, তবে তা সরাসরি ভারতের পূর্ব উপকূলীয় নিরাপত্তা, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তিস্তা প্রকল্পের পর এই করিডোর ঘিরে চীনের আগ্রহ ভারতের কাছে উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাস্তবতার কাঁটা: মিয়ানমারের অস্থিরতা ও রোহিঙ্গা ইস্যু: এই করিডোর বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাধা হলো মিয়ানমার। প্রকল্পের একটি বড় অংশ রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা, যেখানে বছরের পর বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের মধ্যকার সংঘাত এই করিডোরের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এছাড়া, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটির সাথে এই করিডোরের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে। বেইজিং রোহিঙ্গা সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে, তবে করিডোরের নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুকে তারা আলাদা করে দেখবে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র: বাংলাদেশ এখন কোন অবস্থানে: বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যা আগে কখনো ছিল না। চারদিকে বড় শক্তির আকর্ষণ ও বিকর্ষণ:

চীন: অবকাঠামো বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশকে নিজের বলয়ে টানছে।

ভারত: ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের খাতিরে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই স্পর্শকাতর।

যুক্তরাষ্ট্র: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান অটুট রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন।

পাকিস্তান: দক্ষিণ এশীয় নতুন কূটনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তানের সক্রিয়তা বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।

ঢাকার কূটনৈতিক পরীক্ষা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক। তিনি স্পষ্ট করেছেন, বাংলাদেশ কোনো তাড়াহুড়ো করবে না। জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব—এই তিন বিষয়ের কোনোটিই বিসর্জন দিয়ে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হবে না।

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশ এখন এক ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার খেলায় লিপ্ত। চীনের অর্থায়ন প্রয়োজন, ভারতের সাথে বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা জরুরি এবং পশ্চিমাদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। এই ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ সম্পর্কের জটিল অংকে কোনো ভুল পদক্ষেপ বাংলাদেশকেই বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে।

সম্ভাবনা নাকি ফাঁদ: চীনের এই করিডোর প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে যদি বাংলাদেশ তার নিজস্ব শর্তে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিতে পারে।

তবে যদি এটি কোনো ‘ঋণ-ফাঁদ’ (Debt Trap) বা নিরাপত্তার শর্ত জুড়ে দেওয়া চুক্তিতে পরিণত হয়, তবে তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর নিছক কোনো সড়ক বা বন্দর উন্নয়নের প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের কৌশলগত নকশা। আর সেই নকশায় বাংলাদেশ নিজেকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ স্থানে রাখতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই করিডোরের পরিণতি।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ০৯ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *