ডুবন্ত ঢাকা: বৃষ্টি কেন উদ্বেগের জলকাব্য?

ঢাকার আকাশ মেঘলা হওয়া মানেই নগরবাসীর মনে একরাশ উদ্বেগ। সামান্য বৃষ্টিতেই অচল হয়ে পড়া এই শহর এখন স্থবিরতার অন্য নাম। কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প কি কেবলই লোক দেখানো, নাকি এর মূলে রয়েছে নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা? ঢাকার এই চিরচেনা জলাবদ্ধতার সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভুল নগর পরিকল্পনার ফসল।

সংকটের মূলে যে কারণগুলো নিহিত

১. প্রাকৃতিক জলাধার ও খালের বিলুপ্তি: নগরায়ণের আগ্রাসনে ঢাকা থেকে হারিয়ে গেছে খাল, পুকুর ও খেলার মাঠ। মাটি আজ কংক্রিটের চাদরে ঢাকা, ফলে পানি মাটির নিচে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

২. অকেজো ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক: রাজধানীর প্রায় ৫০ শতাংশ ড্রেন অকেজো। সংকীর্ণ ড্রেন আর বছরের পর বছর জমে থাকা পলি ও বর্জ্যে পানির গতিপথ রুদ্ধ।

৩. অপরিকল্পিত নগরায়ণ: একের পর এক উঁচু ভবন নির্মাণ আর বারবার রাস্তার উচ্চতা বৃদ্ধি করায় পার্শ্ববর্তী নিচু বাড়িগুলো এখন ড্রেনের উপচে পড়া পানির ঝুঁকিতে।

৪. সমন্বয়হীনতার গোলকধাঁধা: ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন ও রাজউকের মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

৫. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্যে ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির প্রস্থান পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।

আলোর পথ: আধুনিক সমাধান ও রূপকল্প
স্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল মেগা প্রকল্পের দিকে না ঝুঁকে, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পরিকল্পনা:

‘স্পঞ্জ সিটি’ (Sponge City) ধারণা: কংক্রিটের দাপট কমিয়ে শহরের উন্মুক্ত স্থানে ছিদ্রযুক্ত ফুটপাত, রুফ-টপ গার্ডেনিং এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ছোট জলাধার তৈরি করা।

উৎস বর্জ্য পৃথকীকরণ: বাড়ি থেকেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ড্রেনে প্লাস্টিক বর্জ্য জমা না হয়।

খাল উদ্ধার ও আইনি কঠোরতা: খালের ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে দখলমুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি মনিটরিং নিশ্চিত করা।

ডেটা-চালিত মডেলিং: প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য আলাদা ড্রেনেজ মডেলিং তৈরি করা, যাতে বৃষ্টি শুরুর আগেই পরিস্থিতির পূর্বাভাস পাওয়া যায়।

শক্তিশালী টাস্ক ফোর্স: সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থার অধীনে একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ‘টাস্ক ফোর্স’ গঠন করা।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইফুল ইসলামের মতে, “শত কোটি টাকা খরচ করেও আমরা ব্যর্থ হচ্ছি কারণ আমাদের কাজে সঠিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।” তাই দায়সারা সমাধান নয়, বরং প্রয়োজন সমন্বিত রূপকল্প। নাগরিক অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা অদূর ভবিষ্যতে একটি বাসযোগ্য ও জলাবদ্ধতামুক্ত শহর হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

ঢাকার মানুষ আর হাঁটু বা কোমর সমান পানিতে পথ চলতে চায় না, তারা চায় একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য শহর।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ১৪ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *