টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার(১৪ জুলাই) দুপুরে বরিশাল, ময়মনসিংহসহ অন্তত ১১ জেলায় সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দাবি, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও গতকাল সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এতে অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেননি। দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত, যারা গতকাল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাঁদের পরীক্ষা পুনরায় গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করায় ক্ষমা না চাইলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ ও অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ তুলে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আজ দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা। বেলা তিনটার দিকে তাঁরা মহাসড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একজন হাতেম আলী কলেজ শিক্ষার্থী আলিফ হোসেন বলেন, বৈরী পরিবেশের মধ্যে গতকাল পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া পরীক্ষার আগে পর্যাপ্ত বন্ধ দেওয়া হয়নি। উল্টো অতীতের চেয়ে এবার প্রশ্নপত্র কঠিন করা হয়েছে। এমনকি সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরা পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানালেও শিক্ষামন্ত্রী পাত্তা না দিয়ে অযাচিত মন্তব্য করেছেন। এ জন্য তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের দাবি করছেন।
এদিকে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধের কারণে উভয় পাশে অসংখ্য যানবাহন আটকা পড়ে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী ও চালকেরা। পটুয়াখালী থেকে ঢাকাগামী একটি বাসের যাত্রী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এক ঘণ্টা ধরে এখানে আটকে আছি। কখন ঢাকায় পৌঁছাতে পারব, জানি না।’ ঢাকা থেকে বরগুনাগামী একটি বাসের যাত্রী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মেঘলা ও ভ্যাপসা গরমে অস্বস্তি হচ্ছে। তার ওপর গাড়ি আটকে থাকায় এখন পরিস্থিতি অসহনীয় লাগছে।’
ময়মনসিংহে মহাসড়ক অবরোধ: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে ময়মনসিংহে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে নগরের টাউন হল এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে তাঁরা বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নগরের বিভিন্ন কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা অংশ নেন। তাঁদেরই একজন দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বোর্ডে বন্যা এবং সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পরীক্ষা স্থগিত না করে শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, “আমরা নাকি ফার্মের মুরগি।” অথচ শিক্ষার্থীরা বুকসমান পানি মাড়িয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন। কেন তাঁদের এই দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী এসি রুমে বসে আছেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা কষ্ট করছেন। দেশের আবহাওয়া এত খারাপ ওনার কী চোখে পড়ে না?’
শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ গিয়ে বুঝিয়ে তাঁদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করেন। বেলা আড়াইটায় তাঁরা মহাসড়ক ছেড়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে যান। সেখানে এক ঘণ্টা বিক্ষোভের পর তাঁরা কর্মসূচি শেষ করেন।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আসাদুজ্জামান শাকিল বলেন, যান চলাচলে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন। পরিস্থিতির যাতে কোনো ধরনের অবনতি না ঘটে, সে জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। আশা করছেন শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে।
কুমিল্লায় প্রতিবাদ সমাবেশ: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কুমিল্লায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন একদল শিক্ষার্থী। আজ বেলা সোয়া ১১টার দিকে নগরের কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে ‘কুমিল্লার সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ’–এর ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
এ সময় তিন দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে আমি কে, মুরগি মুরগি, কে বলেছে কে বলেছে, শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী’, ‘শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, মানতে হবে মানতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। পরে দুপুর ১২টার দিকে কান্দিরপাড় থেকে মিছিল নিয়ে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে গিয়ে তাঁরা বিক্ষোভ করেন।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইশাত বলেন, ‘গতকাল আমরা চরম দুর্ভোগ নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কোমরসমান পানি মাড়িয়ে ভেজা কাপড়ে পরীক্ষা দিয়ে তাঁদের অনেক সহপাঠী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণ করে আমাদের সঙ্গে চরমভাবে বৈষম্য করা হচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত চাই।’
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ বলেন, ‘আমি একটি সভায় যোগ দিতে ঢাকায় এসেছি। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশ পালনের বিষয়টি আমার জানা নেই। শিক্ষা বোর্ড সচিবকে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার জন্য বলছি। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জনপ্রশাসন/ কেএ/ ১৪ জুলাই ২০২৬
