বিপন্ন গারো পাহাড়ের সঞ্জীবনী: ভুল বনায়নে বিলুপ্তির পথে ওষুধি সম্পদ

একসময় যে পাহাড় ছিল রোগ-ব্যাধির প্রাকৃতিক চিকিৎসালয়; প্রকৃতির সেই পরম আশীর্বাদ এখন কেবলই ইতিহাস। জামালপুর ও শেরপুর সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আদি ওষুধি ও দেশীয় মূল্যবান বৃক্ষরাজি। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, পাহাড় দখল এবং মাটির বৈশিষ্ট্য না বুঝে করা বাণিজ্যিক বনায়নের ফলে আজ ধ্বংসের মুখে এই অঞ্চলের আদি চিকিৎসা ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য।

হারিয়ে যাওয়া অরণ্য, বিপন্ন লোকজ চিকিৎসা: জামালপুরের বকশীগঞ্জ থেকে শুরু করে শেরপুরের ঝিনাইগাতী হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাহাড়ি অঞ্চল দেশের অন্যতম এক সমান্তরাল বনভূমি। এর মধ্যে জামালপুর ও শেরপুর জেলার ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমি বালিজুরী রেঞ্জের আওতাধীন।আজ থেকে মাত্র দুই দশক আগেও এই পাহাড়গুলোতে বহেড়া, হরিতকী, আমলকী, অর্জুন, নিম, অশ্বগন্ধা ও হরিদ্রার মতো অমূল্য ওষুধি গাছ অনায়াসেই মিলত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসার প্রধান ভরসা ছিল এই বুনো গাছগাছালি। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত কয়েক দশকে সামাজিক বনায়নের নামে ক্ষতিকর আকাশমণি (একাশি) গাছের ব্যাপক চাষ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো দেশীয় ওষুধি গাছগুলো দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকে। ফলে সামান্য ঠাণ্ডা-কাশিতেও এখন পাহাড়ি মানুষকে শহরের চিকিৎসকদের দ্বারে দৌড়াতে হচ্ছে।

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ৯টি ওষুধি উদ্ভিদ ও তাদের ভেষজ গুণ:

অনন্তমূল: (মারমা: তংনুবাং) লতানো এই উদ্ভিদের মূল জন্ডিস, চর্মরোগ, প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া ও কিডনির পাথর চিকিৎসায় অনন্য।

আয়াপান: (চাকমা: বৈসাক) পাতা ও শিকড় জ্বর, পেটব্যথা, শিশুদের ঠাণ্ডাজনিত রোগ এবং রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যবহৃত হয়।

শ্যামালতা: (অন্য নাম: দুধিয়ালতা) প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে, রক্ত পরিষ্কার করতে, বাত ও একজিমা নিরাময়ে এর মূল অত্যন্ত কার্যকরী।

গুইচ্চালতা: (মারমা: লমুন্যুইবাং)২-৪ মিটার উঁচু এই গুল্ম কুষ্ঠ রোগ, ম্যালেরিয়া জ্বর ও কৃমিনাশক হিসেবে দারুণ উপকারী।

জটাশালপানি: (মারমা: য়াংমমনা) পাহাড়ের এই খাড়া গুল্মটি শোথ রোগ, ডায়রিয়া ও চোখের বিষক্রিয়া দূর করতে ব্যবহৃত হয়।

শালপানি: (মারমা: থামংছোবাং) হাড় মচকে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ এবং ফোঁড়া নিরাময়ে এর পাতা ও বাকল ব্যবহৃত হয়।

চালমুগরা: (মারমা: বলগাছ)এর বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল কুষ্ঠ, খোস-পাঁচড়া, রক্তার্শ এবং মাথার খুশকি দূর করতে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত।

কামদেব গাছ: (ইংরেজি: Borneo Mahogany) আলসার ও সাপের কামড়ের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই বিশাল বৃক্ষটি বর্তমানে আইইউসিএন (IUCN) রেড লিস্টে ‘বিপদাপন্ন’ এবং দেশের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত উদ্ভিদ।

কুকুরকট: (অন্য নাম: কালাবুকনন)তিতা বাকলযুক্ত এই গাছের পাতা ও ছাল আদিবাসীদের কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী জ্বরনাশক ও বলকারক হিসেবে পরিচিত।

জলবায়ুর মরণকামড় ও বাস্তুচ্যুত বন্যপ্রাণী

পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় কাটা, পাথর উত্তোলন এবং বন উজাড়ের মতো মানবসৃষ্ট দানবীয় কর্মকাণ্ডের ফলে স্থানীয় জলবায়ুর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে গেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে যেসব উদ্ভিদের জন্ম নেওয়ার কথা, তারা আর টিকতে পারছে না।একই সঙ্গে বনের খাদ্য ও আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় বানর, বন্যহাতিসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী এপার থেকে সীমান্ত পার হয়ে ওপারে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

জামালপুর জেলা বন ও পরিবেশ কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, পাহাড় দখল ও নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের কারণে আজ পাহাড় গাছশূন্য। পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের কারণে পাহাড়ি মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া নানা ফল আর উৎপাদিত হচ্ছে না।

আশার আলো: বন বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাপ্রকৃতির এই বিপর্যয় রোধে বন বিভাগ অবশ্য গত কয়েক বছর ধরে নতুন করে ভাবছে। ময়মনসিংহ বনাঞ্চলের বালিজুরী রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে এই রেঞ্জের ১ হাজার ২৫৫ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে মিশ্র প্রজাতির প্রায় ৩০ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বহুতল বনের ভারসাম্য ফেরাতে আমলকী, হরিতকী, বহেড়া, অর্জুন ও নিমের মতো ঐতিহ্যবাহী ওষুধি গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তবে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হারানো প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোপুরি ফিরে পেতে এবং এই বনায়ন পরিপক্ব হতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।

গারো পাহাড়ের ওষুধি উদ্ভিদের বিলুপ্তি কেবল কিছু গাছের হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং একটি প্রাচীন লোকজ চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক ঢালের মহাপ্রয়াণ। এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বাঁচাতে হলে অনতিবিলম্বে পাহাড় দখল ও পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে হবে এবং বাণিজ্যক গাছের পরিবর্তে দেশীয় ও ভেষজ উদ্ভিদের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রশাসন/কেএ/১৯ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *