কাগজ-কলমে সাফল্য ১০০ ছাড়িয়েছে; কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালের বারান্দায় থামছে না শিশুদের কান্না। সরকারি খাতায় লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ শিশু পেটে নিয়েছে সুরক্ষার ডালপালা— প্রাপ্তির খাতায় ১ কোটি ৮৪ লাখেরও বেশি শিশু। কিন্তু হিসেব মেলাতে পারছে না ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলো। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার টানা দুই মাস পরও হামের প্রাদুর্ভাব থামেনি; প্রতিদিন শনাক্ত হচ্ছে শত শত নতুন রোগী, নিভে যাচ্ছে কচি প্রাণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন স্পষ্ট—তুঙ্গস্পর্শী কভারেজের আড়ালে তবে কি গলদ ছিল প্রচারণায়, নাকি হিসাবের খাতাটাই ছিল ভুল?
পরিসংখ্যান কী বলছে: চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণ দেখা দিলেও মার্চ মাস থেকে মহামারি রূপ নেয় হাম। গত ১৫ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডেটা সংগ্রহ শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। রোববারের (১৯ জুলাই) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:
মোট উপসর্গযুক্ত রোগী: ১,১৭,৬৪৮ জন।
নিশ্চিত হাম রোগী: ১৪,৪৩১ জন।
মোট মৃত্যু: ৭৮৮ জন (নিশ্চিত হামে ৯৫ জন এবং উপসর্গযুক্ত ৬৯৩ জন)।
সাম্প্রতিক চিত্র: শুধুমাত্র শেষ সপ্তাহেই (১৩-১৯ জুলাই) নতুন করে ৬,১৬৮ জন উপসর্গযুক্ত এবং ৯৩১ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন; মারা গেছেন ৩০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভা থেকে শুরু করে সারা দেশে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশু টার্গেট করা হয়। এর বিপরীতে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর কভারেজ দরকার। কিন্তু প্রচারণা, প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নির্ধারণের প্রতিটি ধাপেই ঘাটতি ছিল। তাই ১০৩% টিকা কভারেজের যে দাবি করা হচ্ছে, তা কাল্পনিক এবং অবাস্তব।
এই ব্যর্থতার মূল কারণগুলো হলো: সঠিক তথ্যের অভাব: ২০২২ সালের পুরোনো জনশুমারির তথ্য দিয়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং তৈরি করায় মূল জনসংখ্যার সঠিক হিসাব বাদ পড়ে গেছে। ৬ মাসের কম বয়সী শিশু (যাদের টিকা দেওয়া যায় না) এবং ৫ বছরের বেশি বয়সী যেসব শিশু অতীতেও নিয়মিত টিকা পায়নি—তারা এই বিশেষ ক্যাম্পেইনের বাইরে থেকে গেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিবিড় নজরদারির মাধ্যমে বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
শুধু টিকাই কি যথেষ্ট: আইইডিসিআরের (IEDCR) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, শুধু সুঁচ ফুটিয়ে টিকা দিলেই কোনো মহামারি থামানো যায় না। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আইসোলেশনে রাখা নিশ্চিত করা যায়নি। আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা শিশুদের ট্রেস ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ছিল।

কর্তৃপক্ষের যুক্তি ও বর্তমান পদক্ষেপ: পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছে দাবি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, একসময় দৈনিক উপসর্গযুক্ত রোগী হাজারের ওপরে থাকলেও তা এখন ৬০০–৮০০-তে নেমে এসেছে।
“টিকা দেওয়ার পর প্রতিরোধক্ষমতা তৈরিতে ৩-৪ সপ্তাহ সময় লাগে। এছাড়া হামে আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা হয়, যার কারণে টিকাদানের কয়েক সপ্তাহ পরেও মৃত্যু হতে পারে। সব মৃত্যুই তাৎক্ষণিক হামের কারণে হচ্ছে না।”
বর্তমানে যা করা হচ্ছে: টিকার কার্যকারিতা গবেষণা: টিকা দেওয়া শিশুদের রক্তে আসলেই পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে আইইডিসিআর অনুসন্ধান শুরু করেছে।
নিবিড় অনুসন্ধান: অতিরিক্ত আক্রান্ত ৩০টি উপজেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন করে টিকাবঞ্চিতদের খুঁজে বের করার কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত বার্তা: ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি (NVC)-র চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান হুঁশিয়ার করে বলেছেন, কেবল হাসপাতালের বেড বা ওপরের পরিসংখ্যান দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। ভাইরাসের রূপ পরিবর্তন কিংবা টিকাদানের পর কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে দ্রুত ও গভীর অনুসন্ধান চালানো দরকার।
জনপ্রশাসন/কেএ/২০ জুলাই ২০২৬
