১৯৭৪ সাল। বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মতো যুক্ত হন নারী সদস্যরা। ৭ জন সাব-ইন্সপেক্টর ও ৭ জন কনস্টেবল যোগ দেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে। বর্তমানে ১৮ হাজার নারী পুলিশে কাজ করছেন। সে সময় তাঁদের দায়িত্ব মূলত দাপ্তরিক ও সীমিত পরিসরের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। আজ, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর, সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
একসময় শুধু ‘সহায়ক শক্তি’ হিসেবে বিবেচিত নারী পুলিশ সদস্যরা আজ বাহিনীর প্রতিটি স্তরে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কনস্টেবল থেকে শুরু করে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আসীন হয়ে তাঁরা পুলিশে নারী নেতৃত্বের নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
সাফল্যের যুগলবন্দি
প্রাতিষ্ঠানিক নানা বাধা ও সামাজিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে নারী সদস্যরা আজ কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসআই, এসপি, ডিআইজি এবং অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাহিনীতে ১৭ হাজার ৯৭০ জন নারী সদস্য কর্মরত রয়েছেন, যা মোট জনবলের ৯.০৭ শতাংশ। মহানগর ও জেলা পুলিশের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা এখন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), সিআইডি, পিবিআই, ট্যুরিস্ট ও হাইওয়ে পুলিশ এবং নৌ পুলিশে সফলতার ছাপ রাখছেন।
শুধু দেশেই নয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ‘সর্বনারী ফর্মড পুলিশ ইউনিট’ মোতায়েনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন তাঁরা। পেশাদারিত্ব ও আস্থার জায়গা থেকে নারী পুলিশ সদস্যরা সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের কাছে এক নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছেন।

মাঠপর্যায়ে আস্থার প্রতীক
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিনের মতে, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও দক্ষতার মাধ্যমে নারী সদস্যরা প্রতিটি স্তরে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেন, “পোশাক খাতে অধিকাংশ শ্রমিক নারী। তাই শিল্পাঞ্চলে যেকোনো শ্রম অসন্তোষ নিরসন বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নারী পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া এই বিশাল খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতো।”
দীর্ঘ ১৬ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে শিল্প পুলিশ ইউনিট-৩ (চট্টগ্রাম)-এর পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাদের সাফল্য নবীনদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে। অপরাধ বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “ধর্ষণ বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুরা অনেক সময় পুরুষ কর্মকর্তাদের সামনে নিজেদের ট্রমার কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু নারী তদন্তকারী হিসেবে আমরা খুব দ্রুত তাঁদের আস্থা অর্জন করতে পারি, যা তদন্তের স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি।”
পোশাক শ্রমিকদের যেকোনো জরুরি সহায়তায় ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’-এর শরণাপন্ন হওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
উন্নয়নের কৌশলগত রূপরেখা: বিপিডব্লিউএন
নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত উন্নয়নের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ২০০৮ সাল থেকে কাজ করছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক’ (বিপিডব্লিউএন)। সম্প্রতি রাজারবাগে অনুষ্ঠিত এক পরামর্শ কর্মশালায় সংগঠনটির ২০২৪-২০২৭ কৌশলগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন এর সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশিক্ষণ-২) মোছা. শাহালা পারভীন।
কর্মশালায় সাইবার অপরাধ তদন্ত, মানসিক সুস্থতা এবং কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মতো সময়োপযোগী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি এনরিকো লরেনজোন এবং ইউএন উইমেনের ব্যবস্থাপক শ্রাবণা দত্ত নারী কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশিং এবং টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকারের ওপর বিশেষ জোর দেন। তাঁরা জানান, নারী কর্মকর্তাদের পেশাগত সক্ষমতার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণ আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
নারী সদস্যদের সংখ্যা এবং দায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও, অপারেশনাল পুলিশিং, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং সার্বিক নেতৃত্বে সমান প্রতিনিধিত্ব অর্জনের পথটি এখনও পুরোপুরি মসৃণ নয়।
মহানগর পুলিশে কর্মরত একজন নারী উপপরিদর্শক (এসআই) আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বেড়েছে এবং বড় বড় জটিল অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা আমরা প্রমাণ করেছি। এখন প্রয়োজন গোয়েন্দা কার্যক্রম ও অপারেশনাল নেতৃত্বে আমাদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া।”
বর্তমানে মোট জনবলের মাত্র ৯ শতাংশ নারী হলেও, বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমে নারীরা ক্রমেই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় চলে আসছেন। নিয়োগ বৃদ্ধি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং অপারেশনাল দায়িত্ব সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনের পুলিশ ব্যবস্থা হবে আরও বেশি জেন্ডার-সংবেদনশীল ও জনবান্ধব।
কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি—নারী পুলিশ সদস্যদের এই দীর্ঘ অগ্রযাত্রা কেবল সংখ্যাগত বৃদ্ধির গল্প নয়, বরং এটি সমতা, সক্ষমতা এবং আধুনিক পুলিশিংয়ের এক অনুপ্রেরণাদায়ী অধ্যায়। (নারী পুলিশ সদস্যদের পাঁচ দশকের গৌরবোজ্জল পথচলা নিয়ে এই প্রতিবেদনটি সাজিয়েছেন ‘জনপ্রশাসন’ পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক ফারজানা ইয়াছমিন।)
জনপ্রশাসন/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৫ জুলাই ২০২৬
