রিজার্ভ সংকট, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব—এমন এক চরম অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক চাপের মুখে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এই ক্রান্তিলগ্নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিছক কোনো প্রথাগত দ্বিপক্ষীয় সফর নয়; বরং এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের একটি সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্যের রাজনীতি ভেঙে একটি আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সুযোগ এবং ঝুঁকি নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
পরাশক্তির বলয়মুক্ত ‘গণসার্বভৌমত্বের’ বার্তা:
বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির (বিশেষ করে ভারত) ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ছিল—রাষ্ট্রের ওপর জনগণের শর্তহীন সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরুজ্জীবিত করা এবং চীনের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর কোনো একক পরাশক্তির আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে চায় না। চীন-বাংলাদেশ যৌথ ইশতেহারে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি যে সমর্থনের বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বরাজনীতিতে ঢাকার অবস্থানের একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তন।
বঙ্গোপসাগরে নতুন অর্থনৈতিক নকশা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় ছিল ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ (CMBEC)। এটি কেবল রাস্তা বা বন্দর সংযোগের প্রকল্প নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করার একটি বৈশ্বিক ব্লুপ্রিন্ট।
চীনের সুবিধা: মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বঙ্গোপসাগরে সরাসরি পৌঁছানো।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা:
চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ী বন্দরকে ট্রানজিট হাব থেকে উৎপাদনশীল ‘রিজিওনাল ভ্যালু-এডিশন হাব’-এ রূপান্তর করা।
মূল চ্যালেঞ্জ: মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মির আধিপত্য এবং অমীমাংসিত রোহিঙ্গা সংকট। এই সংকট সমাধানে চীনের রাজনৈতিক প্রভাবকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই এখন ঢাকার প্রধান পরীক্ষা।
ভারতের উদ্বেগ ও ঢাকার কূটনৈতিক পরীক্ষা:
চীনের সাথে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা এবং সিএমবিইসি করিডর সম্পর্কিত চুক্তিগুলোকে দিল্লির কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মহল গভীর অস্বস্তির চোখে দেখছে। ভারতের মূল ভয়—বঙ্গোপসাগরে তাদের একচেটিয়া প্রভাবেই কেবল আঘাত আসবে না, বরং পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা বলয়ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কূটনৈতিক সমীকরণ:
বাংলাদেশকে অবশ্যই দিল্লির কাছে পরিষ্কার করতে হবে যে, চীনের সাথে বাণিজ্য ও সংযোগ প্রকল্পগুলো কোনো প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে ‘প্রক্সি’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য নয়। ভারতের সাথে সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিন্ন নদী ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সম-অধিকারের ভিত্তিতে আস্থা বজায় রাখাই হবে নতুন পররাষ্ট্রনীতির আসল সাফল্য।
ঋণের ফাঁদ ও শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান শিক্ষা: চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে ঝুলছে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর এবং পাকিস্তানের সিপিইসি (CPEC) প্রকল্প। অনুৎপাদনশীল খাতে অপরিকল্পিত চীনা ঋণ বাংলাদেশকে বিপদে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশের করণীয়:
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: যেকোনো বড় চুক্তি স্বাক্ষরের আগে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও সংসদীয় নজরদারি বাধ্যতামূলক করা।
প্রযুক্তি হস্তান্তর: প্রকল্পগুলোতে কেবল চীনা ঠিকাদারের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় শিল্প ও জনবলকে যুক্ত করা।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা: বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা মেপে মেগা প্রজেক্টের অনুমোদন দেওয়া।
সারসংক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
বিশ্বরাজনীতিতে এখন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন বা সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরাশক্তিগুলো আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রের ভেতরে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, গণপ্রতিরক্ষা নীতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সুসংহত করতে হবে।
বাংলাদেশ কার বলয়ে যুক্ত হবে—তা বড় কথা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক চাপ সামলে দেশ কীভাবে নিজের ভূ-অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আর এই রূপান্তরের মূল ভিত্তি হতে হবে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা—‘গণসার্বভৌমত্ব’।
জনপ্রশাসন/ কেএ/ ২৫ জুলাই ২০২৬
