‘দায়মুক্তি’র আড়ালে ব্যাংকের লাখ কোটি টাকার জালিয়াতি

জালিয়াতি, বেনামী ঋণ আর সীমাহীন অনিয়মে খাদের কিনারে গিয়ে ঠেকেছে দেশের ব্যাংকিং খাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত এক দশকে বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ভয়াবহ চিত্র। এ ক্ষেত্রে ক্ষত ঢাকতে তৈরি হয় আইন, নীতি।। কিন্তু সেই আইনের অলিগলিতেই যদি লুকিয়ে থাকে ব্যাংক ফাঁকা করা চিহ্নিত কারিগরদের পুনর্বাসনের চোরাপথ—তবে তাকে সংস্কার নয়; বরং বলা যায় ‘আইনি দায়মুক্তি’।

যেভাবে লোপটা হয় অর্থ: আদালতের রীটের মাধ্যমে খেলাপি ঘোষণা স্থগিত: অনেক বড় খেলাপি গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করেই ব্যাংকের নোটিশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রীট আবেদন করে স্থগিতাদেশ বা ‘স্টে অর্ডার’ নিয়ে থাকেন। এর ফলে ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঘোষণা করতে বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আইনি জটিলতায় পড়ে।

নামসর্বস্ব কোম্পানি ও ভুয়া এলসি: কাগজে-কলমে ভুয়া প্রতিষ্ঠান (shell/dummy companies) তৈরি করে, ভুয়া আমদানি-রপ্তানি নথি বানিয়ে বা ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঋণ অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়।

বারবার ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ (Loan Restructuring): আইনের সুনির্দিষ্ট নিয়মের সুযোগ নিয়ে সামান্য কিছু ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বারবার খেলাপি ঋণ নিয়মিত (regularize) দেখানো হয়। এতে খাতায় ঋণটি ‘ভালো’ দেখালেও বাস্তবে অর্থ আদায় হয় না।

জামানতের অতিরিক্ত মূল্যায়ন: কম মূল্যের জমি বা সম্পদ জামানত রেখে অনিয়ম ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে তার বহু গুণ বেশি বাজারমূল্য দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ উত্তোলন করা হয়।

বর্তমান পদক্ষেপ ও আইনি সংস্কার: অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে দুদক (অ্যান্টি-কারাপশন কমিশন) ও সিআইডি মামলার পাশাপাশি সম্পদ ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের ব্যবস্থা নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা কঠোরকরণ: বেনামি ঋণ রোধ, পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব হ্রাস এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের (willful defaulters) বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

দেশের আর্থিক খাতের এই অভূতপূর্ব দেউলিয়াত্ব ও দুর্নীতির প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠনে পাস হয়েছে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’। তবে আইনটির বিশেষ ‘১৮(ক)’ ধারায় ব্যাংক ধসের পেছনে দায়ী সাবেক মালিকদেরই স্বল্প শর্তে পুনঃমালিকানায় ফেরার সুযোগ দেওয়ায় তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

১৮(ক) ধারা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক: নতুন পাস হওয়া আইনের ১৮(ক) ধারার শর্ত অনুযায়ী, পুনর্গঠন বা সংকটে পড়া ব্যাংকের সাবেক মালিকেরা নির্ধারিত অর্থের ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়ে ব্যাংকটির শেয়ার ও সম্পদের মালিকানায় ফিরতে পারবেন। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের জন্য ১০ শতাংশ সুদে দুই বছর সময় পাবেন তারা।

এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ বিধান ছিল—ব্যাংকের সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গ্রুপ অর্থ পরিশোধ করলেও তারা আর ব্যাংকের মালিকানায় ফিরতে পারবেন না। নতুন আইনে সেই বিধানে পরিবর্তন এনে শর্তসাপেক্ষে পুনঃমালিকানার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

সরকার ও আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে—ব্যাংক চালু রাখা, আমানতকারীদের আমানত রক্ষা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থেই সংসদে আইনটি পাস করা হয়েছে।

তবে এই বিধানের তীব্র সমালোচনা করেছে সুশাসনের প্রধানতম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতের অনিয়মে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের পুরস্কৃত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। শর্ত পূরণের অজুহাতে নতুন ঋণ নেওয়ার বা ঋণখেলাপি শিথিলতার সুবিধা তৈরির ঝুঁকি থেকে যায়, যা শেষ পর্যন্ত আমানতকারী ও সাধারণ জনগণের ওপর প্রভাব ফেলবে।” টিআইবি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্তটি গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।

পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও নীতি গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বে (Conflict of Interest) পড়ার আশঙ্কার বিষয়ে কথা উঠছে।

গত এক দশকে অর্থ পাচারের চিত্র: এদিকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক ওয়ার্কিং কমিটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিসইনভয়েসিং বা আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম বা বেশি দেখানোর মাধ্যমেই অর্থ পাচারের বড় অংশটি ঘটেছে।

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাধা ও সরকারি উদ্যোগ: বর্তমানে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য চাইতে হলে প্রশাসনিক আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং পরিশেষে ওই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে হয়। প্রচলিত এই প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায়, চূড়ান্ত পদক্ষেপে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তরা অর্থ অন্য দেশে স্থানান্তরের সুযোগ পায়। ফলে তদন্তপ্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আইনি প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বিলম্ব কমাতে এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি যোগাযোগের একটি আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার।

এমএলএ (MLA) চুক্তি: পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা’ (Mutual Legal Assistance – MLA) চুক্তিকে সবচেয়ে কার্যকরী মনে করা হচ্ছে। সরকার ১০টি দেশের সাথে এমএলএ চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সাথে আলোচনা চলছে।

বিএফআইইউ-এর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে আগের পারস্পরিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় বর্তমান বৈঠকগুলোতে সেগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, “অর্থ পাচার শুধু রিজার্ভ বা রাজস্বের ক্ষতি করে না, এটি দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন করে যাতে অর্থ পাচার না হতে পারে, সে পথ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।”

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ গোয়েন্দা সংস্থা ‘এগমন্ট গ্রুপ’-এর সদস্য হলেও প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শেষ না হওয়ায় এখনো আর্থিক তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময়ের বৈশ্বিক ব্যবস্থা ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ (CRS)-এ যুক্ত হতে পারেনি।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ২৯ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *