জীবনের তাগিদে গিয়ে বাসের চাপায় পিষ্ট শ্রমিকের স্বপ্ন

একই সূর্য উঠেছিল আজকের সকালটায়। কিন্তু সেই ভোরের আলো অনেকের জীবনের শেষ আলো হয়ে আসবে—তা কেউ বুঝতে পারেনি। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে বগুড়া ও সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ১৫টি তাজা প্রাণ, আহত হলেন ৩৪ জন।

এছাড়া দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও ভেসে আসছে সড়ক দুর্ঘটনার খবর। নিহতদের কেউ পরিবারে খাবার জোগাতে কাজ খুঁজতে বের হয়েছিলেন, কেউবা বন্ধুদের সাথে জিয়ারত শেষে বাড়ি ফিরছিলেন।

বগুড়া: এরুলিয়া সিল্কিবান্দা এলাকা। ঢাকা-সিলেট বা বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের পাশেই প্রতিদিন সকালে জড়ো হন দিনমজুরেরা।

সকালে গাইবান্ধার আমিরুল, নূর আলম, আবদুস ছামাদ, বেলাল আর জয়পুরহাটের তাজমুল ও ফয়জাররাও এসেছিলেন একটু কাজের আশায়—যাতে দিনশেষে পরিজনদের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়া যায়।

সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের অনিয়ন্ত্রিত একটি বাস সব এক লহমায় শেষ করে দিল। বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা দিয়ে বাসটি সোজাসুজি পিষে দিল সেই মানুষগুলোকে, যারা পেটের টানে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন।

ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনজন, হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজন। তাদের রক্তে ভেসে গেল বগুড়ার রাজপথ। নিহতদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল চত্বর—যে রুটি-রুজির সন্ধানে বাবা বা ভাই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, এখন তাদের ফিরতে হচ্ছে নিথর দেহে।

জিয়ারতের খুশি নিমিষেই রূপ নিল শোকের মাতমে

একই সকালে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপনে ঘটে আরেক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহন আর ঢাকামুখী ইউনিক পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে খাদে পড়ে যায় ইউনিক পরিবহনের বাসটি। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আটজন যাত্রী।

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থেকে পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে এসেছিলেন। জিয়ারত শেষে দুইজন বিমানে ফিরলেও ফারুক মিয়া আর সাইফুল ইসলামসহ তিনজন ফিরছিলেন বাসে। ফারুক মিয়া যখন হাসপাতালে চোখ মেলেন, তখন তিনি জানতে পারেন তাঁর প্রিয় বন্ধু সাইফুল আর নেই। হাসপাতালে শুয়ে স্তব্ধ চোখে ফারুক বলছিলেন, বাসে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বিকট এক শব্দ… চোখ খুলে দেখি চারপাশে রক্ত আর হাহাকার। আমার বন্ধু সাইফুল আর বেঁচে নেই।

অন্য সড়কেও লাশের মিছিল

শুধু সিলেট ও বগুড়াতেই নয়, দেশের অন্যান্য সড়ক-মহাসড়কেও যেন আজ রক্তের হোলি খেলা চলছে। প্রতিদিনের মতো শুক্রবারও জীবনের তাগিদে ঘর থেকে বের হওয়া কিংবা গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা বেশ কয়েকজন মানুষ অকালে ঝরে গেছেন। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ।

একটি স্থায়ী প্রশ্ন ও অনিশ্চিত পথচলা

দেশের সড়কগুলো যেন প্রতিদিন এক একটি মৃত্যুকূপ। চালকের বেপরোয়া গতি, ঘুমচোখে গাড়ি চালানো নাকি অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা—কার দায় এই জীবনগুলোর? প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পরিসংখ্যান বাড়ে, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু যেসব সন্তান আজ এতিম হলো, যেসব মা-বাবা আজ সন্তানহারা হলেন—তাদের সেই শূন্যতা পূরণ করবে কে?

প্রতিটি জীবনের পেছনে একটি পরিবার থাকে, হাজারো স্বপ্ন থাকে। আজ সকালে রাজপথে ঝরে যাওয়া ১৫টি প্রাণ কেবল একটি সংখ্যা নয়, ১৫টি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প। রক্তে ভেজা এই রাজপথ যেন প্রতিদিন আমাদের একটাই প্রশ্ন করে যায়—আর কতকাল এমন মর্মান্তিক খবর দেখে আমাদের সকাল শুরু হবে?

জনপ্রশাসন /কেএ/ ০৭ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *