নতুন ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ

ইউক্রেন সংঘাত ও বৈশ্বিক আর্থিক জটিলতার মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক নতুন মোড় নিচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়েছে। তবে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের অস্থিরতা এখন প্রধান উদ্বেগ।

রাশিয়া-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও কৌশলগত ভারসাম্য

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র, খাদ্য ও সার আমদানিতে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি পোশাকের অর্থ আদায়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় পেমেন্ট চ্যানেল সুগম করার চেষ্টা চলছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি সতর্ক করে বলেছে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এখন সরাসরি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও লেনদেনের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, বৈশ্বিক চাপ সামলাতে ওয়াশিংটনের সাথে সুসম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে নমনীয় ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক নীতি বজায় রাখাই ঢাকার জন্য সবচেয়ে দূরদর্শী কৌশল।

বিপুল মুনাফার পর বিপিসির আকস্মিক তারল্য সংকট

এক দশকে বিপুল মুনাফা করলেও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তায় তেল আমদানি খরচ, জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপিসি নগদ অর্থ সংকটে পড়েছে। লিটারপ্রতি ডিজেলে লোকসান হওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটসহ মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ ও স্থায়ী আমানতের অর্থ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিপিসির চাওয়া আর্থিক সহায়তার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। তবে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়নি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিপিসির নিজস্ব আমানত সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকলে বর্তমান সংকট তারা নিজেরাই সামাল দিতে পারত। প্রকৃত তারল্য ঘাটতি পরিমাপ করতে তিনি একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের অর্থনৈতিক নিরীক্ষার তাগিদ দেন।

মূল্যস্ফীতির চাপ ও মুদ্রানীতির দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ

বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমালেও এতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির কারণ কেবল চাহিদার আধিক্য নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, সিন্ডিকেট, পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি এবং বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। এছাড়া সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক-ঋণের ফলে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব তৈরি হচ্ছে, যা বেসরকারি ঋণে বাধা সৃষ্টি করছে।

তবে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে হলে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার, বাণিজ্যিক চ্যানেল বহুমুখী করা এবং বন্ধ কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি।

জনপ্রশাসন /কেএ/ ০৭ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *