বজ্রপাতের মৃত্যুফাঁদে দেশ, ১২ বছরে ৩,৮৬০ প্রাণহানি

‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’— আজ আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবসে এমন গালভরা স্লোগান শুনতে বেশ লাগে। কিন্তু নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ বা মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরের মাঝখানে কাজ করা কৃষকের মাথা গোঁজার সেই ‘ঘর’ ঠিক কোথায়, সেই উত্তর সম্ভবত কর্তৃপক্ষেরও জানা নেই।

সচেতনতার বার্তার আড়ালে বাংলাদেশ ক্রমেই বজ্রপাতের এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত ১২ বছরে দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন। অর্থাৎ, বছরে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ স্রেফ পুড়ে অঙ্গার হচ্ছেন। উন্নত প্রযুক্তির কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে মৃত্যুর এই মিছিল থামানোর কোনো বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেই।

বিশ্বের কোথায় বজ্রপাত বেশি হয় এবং কেন?
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় ভেনিজুয়েলার ‘লেক মারাকাইবো’ (Lake Maracaibo) এলাকায়। এ ছাড়া মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতেও বজ্রপাতের হার মারাত্মক। এর মূল কারণ ভৌগোলিক। চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত বিশাল জলভাগ, বিষুবীয় অঞ্চলের প্রচণ্ড তাপ এবং আর্দ্রতার কারণে সেখানে সারা বছরই বজ্রপাত সৃষ্টিকারী মেঘ তৈরি হয়।

তবে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট মৃত্যুর সংখ্যায় বিশাল আয়তনের কারণে ভারত এগিয়ে থাকলেও, আয়তনের তুলনায় মৃত্যুঝুঁকিতে বিশ্বে সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতি ১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহারে আমরাই শীর্ষে।

বাংলাদেশ কেন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ‘ডেথ জোন’? বাংলাদেশে বজ্রপাতের তীব্রতা বৃদ্ধির পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুই ধরনের কারণই সমানভাবে দায়ী।

ভৌগোলিক অবস্থান: বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। মার্চ থেকে মে মাসে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাস যখন উত্তরের হিমালয়ের ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন বায়ুমণ্ডলে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় দানবাকৃতির কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ, যা প্রলয়ংকরী বজ্রপাতের মূল উৎস।

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের হার অন্তত ১২ শতাংশ বেড়ে যায়।

নির্বিচারে গাছ নিধন: একসময় গ্রামবাংলায় প্রচুর তাল, নারকেল ও সুপারির মতো উঁচু গাছ ছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রপাত নিরোধক হিসেবে কাজ করত। আমরা সেগুলো কেটে সাবাড় করে দিয়েছি।

মৃতের সংখ্যা কেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে?
মৃত্যু বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের অপর্যাপ্ত এবং অবাস্তব প্রস্তুতি। বজ্রপাতের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত হাওরাঞ্চলে কৃষকরা বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে কাজ করেন। যখন বজ্রপাত হয়, তখন সেই সমতল প্রান্তরে সবচেয়ে উঁচু বস্তু থাকেন ওই কৃষক নিজেই। ফলে বজ্রপাতে সরাসরি তিনিই শিকার হন।

আর আমাদের সতর্কতা ব্যবস্থা? স্মার্টফোনের অ্যাপ বা এসএমএসের নোটিফিকেশন দেখে কৃষক কাদামাটি মাখা হাত মুছে নিরাপদ আশ্রয়ে দৌড়াবে, এমনটা ভাবা কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসেই সম্ভব। সময়মতো, বোধগম্য ভাষায় এবং সঠিক জায়গায় সতর্কবার্তা পৌঁছানোর গোটা সিস্টেমটাই এখানে অকেজো।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা
গত ১২ বছরে দেশে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন। বছরে গড়ে ৩০০-৩৫০ জন মারা যাচ্ছেন। নিহতদের ৭০ শতাংশেরও বেশি কৃষক ও জেলে, যারা জীবিকার তাগিদে উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন।

এই মৃত্যুফাঁদ থেকে বাঁচার উপায় কী?
বজ্রপাত ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু প্রাণহানি কমানো শতভাগ সম্ভব, যদি পলিসি মেকাররা স্লোগান দেওয়া বাদ দিয়ে বাস্তবভিত্তিক কাজ করেন। স্মার্টফোন অ্যাপের বদলে হাওর ও বিল অঞ্চলে লাউড সাইরেন সিস্টেম বসাতে হবে। মেঘের অবস্থা বুঝে ২০-৩০ মিনিট আগেই যেন সাইরেন বেজে ওঠে এবং কৃষকরা সতর্ক হতে পারেন।

বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছোট, কংক্রিট ও টিনের শেডযুক্ত আশ্রয়কেন্দ্র বানাতে হবে, যেখানে আর্থিং সিস্টেম থাকবে। হাওর ও খোলা মাঠে সরকারি উদ্যোগে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড (Arrester) স্থাপন করতে হবে।

তালগাছ লাগানোর প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদী। একটি তালগাছ বড় হতে ২৫-৩০ বছর লাগে। তাই এর পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল উঁচু গাছও রোপণ করতে হবে। ঘন কালো মেঘ দেখলে বা মেঘের ডাক শুনলে দ্রুত পাকা বা আচ্ছাদিত ভবনে আশ্রয় নিতে হবে।

খোলা মাঠে বা হাওরে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত শুরু হলে দৌড়াদৌড়ি না করে, দু’পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে হাঁটু মুড়ে মাথা নিচু করে (গুটিসুটি মেরে) বসে পড়তে হবে। কোনোভাবেই মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না।

আশেপাশে কোনো বৈদ্যুতিক খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার বা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না। ধাতব বস্তু (যেমন: কাস্তে, কোদাল, ছাতা) থেকে দূরে থাকতে হবে। জলাশয়ে নৌকায় থাকলে দ্রুত ডাঙায় ফিরে আসতে হবে।

প্রকৃতির নিয়মে বজ্রপাত হবেই। কিন্তু কার্যকর পূর্বাভাস সিস্টেম এবং মাঠপর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে না পারলে, শুধু ‘আন্তর্জাতিক দিবস’ পালন করে আর স্লোগান আউড়ে এই লাশের সারি ছোট করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *