সরকারি হিসাবরক্ষণ অফিসের একটা অডিট রিপোর্ট তৈরি হতে গড়ে সময় লাগে ৭২ মাস, অর্থাৎ ছয় বছর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন শাখার তথ্য একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত নয় বলে কর ফাঁকির সুযোগ থেকেই যায়। আবার দেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সংস্থা সরকারের ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠেছে। এই পুরোনো দুর্বলতাগুলো ঘুচিয়ে সরকারি প্রশাসনে গতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফেরাতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল বিপ্লবের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। তাতে ২৫ কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।
রোববার (২৮ জুন) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় ‘স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ (এসআইটিএ) প্রকল্পের অগ্রগতি ও লক্ষ্য নিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রকল্পটি পাঁচটি মূল সরকারি সংস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল, তথ্যপ্রমাণভিত্তিক ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন, কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন পুরো গতিতে চলতে পারে না। এই প্রকল্প সেই বাধা দূর করতেই নকশা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিকল্পনা বিভাগ (পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ), বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) এবং অডিটর জেনারেল ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় (ওসিএজি)—এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নে ঢালা হবে অর্থ।
সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাটি অডিটর জেনারেলের কার্যালয়ে। বর্তমানে কোনো প্রকল্প বা দপ্তরের হিসাবের নিরীক্ষা রিপোর্ট চূড়ান্ত হতে ৬ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এতে করে আর্থিক অনিয়ম বা দুর্বলতার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসআইটিএ প্রকল্প অডিট প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করবে। কাগজপত্রের স্তূপ সরিয়ে রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালাইসিস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) চালিত ঝুঁকি নিরূপণ এবং ডিজিটাল ওয়ার্কফ্লো চালু হবে। লক্ষ্য একটাই—অডিট রিপোর্ট তৈরির সময় ৭২ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাসে নামিয়ে আনা। এতে আর্থিক অনিয়ম দ্রুত ধরা পড়বে, জবাবদিহি বাড়বে।
কর আদায়ে গতি আনতে এনবিআরকে দেওয়া হবে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অবকাঠামো। ভ্যাট ও আয়করের সব তথ্য এক সুতায় বাঁধতে ই-ইনভয়েসিং চালু হবে। মানে, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যখন পণ্য বিক্রি করবে, তখনই তার তথ্য রিয়েল টাইমে চলে যাবে এনবিআরের ড্যাশবোর্ডে। ভুয়া চালান দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির পথ বন্ধ হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কর ফাঁকির ঝুঁকিপূর্ণ কেস চিহ্নিত করা হবে। করদাতার সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে আনার মাধ্যমে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ সেবা নিশ্চিত করা হবে, যা ব্যবসার খরচ ও সময় দুটোই বাঁচাবে।
পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়িত হয়, তার অগ্রগতি এখনো অনেকটাই কাগজে-কলমে প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রকল্পের আওতায় বিভাগটি একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পাবে। এআই চালিত অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে কোন প্রকল্প কেমন চলছে, খরচের গতি, অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা—সবই একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে ভেসে উঠবে। রিয়েল টাইম মনিটরিং টুল চালু হলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নয়, চলন্ত অবস্থাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, বাড়বে অর্থের সদ্ব্যবহার।
ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থা ইতোমধ্যে চালু থাকলেও এতে আরও শান দেওয়া হবে। বিপিপিএ-এর ই-জিপি সিস্টেমে যুক্ত হবে উন্নত ডিজিটাল ফিচার, যা পুরো ক্রয়চক্র দরপত্র আহ্বান থেকে চুক্তি স্বাক্ষর ও বিল পরিশোধ—সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ করবে। দরপত্র মূল্যায়নে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দরপত্রের কারসাজি শনাক্তকরণ, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এনবিআরের সঙ্গে তথ্যের সমন্বয় সাধিত হবে। এতে করে অর্থের সঠিক মূল্য (ভ্যালু ফর মানি) নিশ্চিত হবে এবং দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত হবে।
পরিকল্পনার ভিত শক্ত করতে দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। বিবিএসের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার তথ্য একীভূত করে নীতিনির্ধারকদের জন্য সহজলভ্য হবে। জনশুমারি থেকে কৃষি জরিপ, সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। এআই ও জিওস্পেশাল প্রযুক্তির ব্যবহার তথ্যের গুণগত মান বাড়াবে এবং নীতি নির্ধারণ হবে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক।
উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্রয় ও রাজস্ব আদায়ের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়।
এসআইটিএ প্রকল্প শুধু প্রযুক্তি কেনা নয়, বরং জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং পদ্ধতির সহজীকরণেও জোর দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘সঠিক সময়ে অডিট রিপোর্ট পাওয়া গেলে যেমন দুর্নীতি রোধ হয়, তেমনি একটি ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাকে সচল রাখে। এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত রচনা করবে।’
বাস্তবায়ন সফল হলে খুব শিগগিরই একজন করদাতা ঘরে বসে এআই সহায়তায় রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, একজন ঠিকাদার সম্পূর্ণ অটোমেটেড সিস্টেমে দরপত্র জমা দিচ্ছেন, আর একজন নীতিনির্ধারক ভুল তথ্যের বদলে রিয়েল টাইম সঠিক ডেটা দেখে বাজেট বরাদ্দ দিচ্ছেন, এমন বাংলাদেশের ছবি আর কল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, বাস্তবেই ধরা দেবে।
জনপ্রশাসন/ কেএএস/ জেডআরসি/ ২৮ জুন ২০২৬
