মহাসড়কের নতুন আতঙ্ক অ্যাম্বুলেন্স!

সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দে রাজপথ থমকে দাঁড়ায়, সাধারণ গাড়িগুলো পাশে সরে গিয়ে জায়গা করে দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—একটি মুমূর্ষু প্রাণ বাঁচানো, দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো। কিন্তু যে বাহনের ওপর ভিত্তি করে স্বজনরা আশার আলো দেখেন, সেই অ্যাম্বুলেন্সই এখন মহাসড়কে রূপ নিচ্ছে চরম মৃত্যুফাঁদে। একের পর এক মুখোমুখি সংঘর্ষ, পেছন থেকে ধাক্কা কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন রোগী, স্বজন ও চালক নিজে।

প্রশ্ন উঠছে—জীবন বাঁচানোর এই জরুরি বাহন কতটা নিরাপদ?

সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনার দিকে তাকালেই ফুটে ওঠে এই নির্মম বাস্তবতা:

ফরিদপুরের ট্র্যাজেডি: ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায় একটি অ্যাম্বুলেন্স। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সেটির পাঁচ আরোহী।

সাভারে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ: ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুটি বাসের চাপে অ্যাম্বুলেন্সের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে প্রাণ যান চারজনের, আহত হন ১৫ জন।

পাবনা ও সীতাকুণ্ডে দুর্ঘটনা: পাবনার সাঁথিয়ায় বাসের ধাক্কায় চালক ও শিশু কেয়ার নানিসহ নিহত হন তিনজন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নবজাতকের মরদেহ বহনকারী যান দুর্ঘটনায় পড়ে গুরুতর আহত হন একাধিক ব্যক্তি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ। রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থা এবং স্বজনদের মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে চালকরা অনেক সময় বিপজ্জনক গতি ও ওভারটেকিংয়ের ঝুঁকি নেন। যানজট ঠেলে দ্রুত পৌঁছাতে মহাসড়কে উল্টো পথে অ্যাম্বুলেন্স চালানো এখন নিত্যদিনের চিত্র, যা প্রায়ই মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটাচ্ছে। টানা ড্রাইভিংয়ের কারণে চালকদের শারীরিক ক্লান্তি এবং একটি বড় অংশের চালকদের মাদকাসক্তি দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেকে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটে লাইসেন্স নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত কারিগরি ফিটনেস না থাকা সত্ত্বেও পুরোনো গাড়ি অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে কথা হয় রোগী আফতাব হোসেনের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ ভাবি অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা সবচেয়ে দক্ষ। কিন্তু চালকের বৈধ লাইসেন্স বা গাড়ির ফিটনেস আছে কি না, তা আমাদের জানার কোনো উপায় নেই। সরকারের সঠিক নজরদারি ছাড়া এই ভয় কাটবে না।

অভিযোগের জবাবে চালক বাশার ও হাবিব উল্লাহ বলেন, রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে স্বজনদের মারাত্মক চাপ থাকে। বাধ্য হয়ে আমাদের গতি বাড়াতে হয় বা উল্টো পথে যেতে হয়। কোনো চালকই ইচ্ছা করে নিজের ও অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে না।

চালকদের অবহেলা কিছুটা নাকচ করলেও ভেতরের অনিয়মের কথা স্বীকার করেন বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা। তিনি জানান, এখন বিদেশ থেকে প্রস্তুত মানসম্মত গাড়ি আসছে ঠিকই, তবে অনেক চালক মাদকাসক্ত। ভুয়া লাইসেন্স ও দালাল চক্রের দাপট বন্ধ করতে চালকদের নিয়মিত ‘ডোপ টেস্ট’ বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রোড সেফটি শাখার উপপরিচালক সুবীর কুমার সাহা এ প্রসঙ্গে জানান, লাইসেন্স দেওয়ার আগে ডোপ টেস্ট রিপোর্ট যাচাই করা হয়। কোনো চালকের বিরুদ্ধে মাদকের প্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তারা চার দফা সুপারিশ করছেন। মহাসড়কগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের জন্য ডেডিকেটেড বা পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা। সাধারণ চালকদের চেয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালকদের জন্য বিশেষ কারিগরি ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। বিআরটিএ কর্তৃক ফিটনেস পরীক্ষা জোরদার এবং সড়ক নামার আগে চালকদের নিয়মিত ডোপ টেস্ট নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক সংস্কৃতি উন্নত করে সাধারণ পথচারী ও চালকদের মধ্যে জরুরি বাহনকে আগে পথ ছাড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।

সাইরেনের শব্দ যেন পরিবারের জন্য আশার বার্তা নিয়ে আসে, কোনো স্বজন হারানোর কান্নার পূর্বাভাস না হয়ে ওঠে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ০৩ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *