আমলাতন্ত্রের কব্জায় দুদক: নতুন আইনে খর্ব হচ্ছে ক্ষমতা ও স্বাধীনতা

সাংবিধানিক মর্যাদা উপেক্ষিত • শূন্য পদে সচিবের একচ্ছত্র আধিপত্য • বাতিল হচ্ছে সরাসরি গ্রেফতারের ক্ষমতা

◉➤ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের যে দাবি উঠেছিল, প্রস্তাবিত ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় তার উল্টো চিত্র উঠে এসেছে। নতুন এই আইনে দুদক সাংবিধানিক মর্যাদা তো পাচ্ছেই না, উল্টো আসামিকে সরাসরি গ্রেফতারের ক্ষমতা ও নিজস্ব আর্থিক স্বাধীনতা হারাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কমিশনের শীর্ষ পদগুলো শূন্য থাকলে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার একক ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে সরকার-নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সচিবকে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে কার্যত দুদককে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আইনি বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করা হচ্ছে, যা দুর্নীতি দমনে সংস্থাটিকে আরও অকার্যকর করে তুলবে।

আমলার হাতে কমিশনের চাবিকাঠি
সংশোধিত খসড়া আইনের ধারা ১০-এ সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পদ শূন্য থাকলে কমিশনের সরকার-নিযুক্ত সচিবই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন এবং তা কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে। ইতোমধ্যেই গত তিন মাস ধরে দুদকের নতুন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এই শূন্যতার সুযোগে একজন আমলার হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পণকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক এবং দুদক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশনহীন বর্তমান অবস্থার সুযোগে সচিবের হাতে দুদকের নির্বাহী ক্ষমতা অর্পণের সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে তিনজন ও সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী পাঁচজনের যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এককভাবে সচিবের হাতে অর্পণের এই সুপারিশ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠার ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ প্রয়াস।

সাবেক জ্যেষ্ঠ বিচারক ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতের সাবেক বিচারপতি ড. শাহজান সাজু বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানটিকে আমলাতান্ত্রিক সংস্থায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সার্চ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আমলাদের হাতে দুদকের শীর্ষ নেতৃত্ব চলে গেলে তদন্তের নিরপেক্ষতা পুরোপুরি নষ্ট হবে। আমলাদের নিজেদের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত একজন সচিবের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

খর্ব হচ্ছে গ্রেফতারের ক্ষমতা ও আর্থিক স্বাধীনতা
২০০৪ সালের আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, সম্পদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে যেকোনো আসামিকে গ্রেফতারের ক্ষমতা দুদক কর্মকর্তাদের ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন আইনে এই ক্ষমতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি তদন্তে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে দুদককে পুরোপুরি পুলিশের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।

এর পাশাপাশি খর্ব করা হয়েছে আর্থিক স্বাধীনতাও। আগে সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়াই বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পারত সংস্থাটি। খসড়া আইনের ২৫ ধারা প্রতিস্থাপন করে বলা হয়েছে, এখন থেকে বাজেট নির্ধারিত হবে ‘সরকারের প্রস্তাব বিবেচনাক্রমে’।

ড. শাহজান সাজু , এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে কোনো সংস্থাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন বাতিলের ফলে বিচার বিভাগের আর্থিক ক্ষমতা খর্ব হওয়ার যে পরিণতি আমরা দেখেছি, দুদকের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হবে।

উপেক্ষিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ‘দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন’ সংস্থাটিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করতে ৪৭টি সুপারিশ জমা দেয়। কিন্তু নতুন আইনে সেসব মৌলিক সুপারিশ প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই: ‘জুলাই সনদ’ ও সংস্কার কমিশনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুদককে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয়নি; কেবল ‘সংবিধিবদ্ধ’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরিবর্তনযোগ্য।

স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল: নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে ৭ সদস্যের যে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’র প্রস্তাব করা হয়েছিল, নতুন আইনে তা রাখা হয়নি।

নেতৃত্বের পরিধি সংকোচন: সংস্কার কমিশন সদস্য সংখ্যা ৩ থেকে বাড়িয়ে ৫ জন করার সুপারিশ করলেও, উল্টো তা কমিয়ে ৪ জন করা হচ্ছে। কমিশনারদের মেয়াদও ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৪ বছর করা হয়েছে।

আশার আলো: কিছু ইতিবাচক সংশোধনী
ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেও প্রস্তাবিত খসড়া আইনে দুর্নীতি দমনে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও ইতিবাচক দিক যুক্ত করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

নতুন অপরাধ সংযুক্তি: ইনসাইডার ট্রেডিং, কর ও শুল্ক জালিয়াতি এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের অপরাধসমূহ এখন থেকে দুদকের এখতিয়ারভুক্ত হবে।

পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল: সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে আগের মতো আর সরকারের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না।

সরাসরি এজাহার: তদন্ত-পূর্ব আবশ্যিক অনুসন্ধান বাতিল করে সরাসরি এজাহার দায়েরের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা সময়ক্ষেপণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, আইনগত এখতিয়ার বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া দুদক কখনোই দুর্নীতি দমনে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। আমলাতন্ত্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়লে এই নতুন ক্ষমতাগুলোও শেষ পর্যন্ত অকার্যকরই থেকে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *