বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি গাছ রোপণের একটি বিশাল ও উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। কিন্তু এই উদ্যোগের প্রাক্কালে পরিবেশবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা বলেছে, আমরা কি আসলেই একটি জীবন্ত ‘বন’ সৃষ্টি করতে চাই, নাকি কেবল কাঠ উৎপাদনের জন্য সাজানো ‘বৃক্ষখামার’ বানাতে চাই?
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী প্রজন্ম একটি সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র পাবে, নাকি কেবল এক টুকরো সবুজ মরুভূমি। কাগজে-কলমে সবুজ, বাস্তবে বিপন্ন বাস্তুতন্ত্রবাংলাদেশে বন নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ব্যবধান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কিংবা সরকারি নথিতে বন সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা বারবার বলা হলেও স্বাধীনতার পর থেকে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে।
বনবিজ্ঞানীদের মতে, একটি বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়। বন হলো উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক, অণুজীব, পরাগবাহক, মৃত্তিকা এবং খাদ্যজালের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু বাংলাদেশের বননীতির (১৯৭৯, ১৯৯৪ এবং ২০১৬ সালের সংশোধিত রূপ) প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রধান সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে-কত হেক্টর জমিতে চারা লাগানো হলো বা কত ঘনমিটার কাঠ উৎপাদিত হলো। ফলে ‘বন’ এবং ‘বৃক্ষরোপণ’—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা নীতিনির্ধারণে একাকার হয়ে গেছে।
আইনগত বন বনাম প্রকৃত বনের ব্যবধান: বাংলাদেশে প্রায় ১৮.৮ লাখ হেক্টর জমি বনভূমি হিসেবে তালিকাভুক্ত, যার মধ্যে ১২.২ লাখ হেক্টর সংরক্ষিত বন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর প্রকৃত বন-আচ্ছাদন অঞ্চলভেদে ১৩ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। স্বাধীনতার সময় দেশের মোট ভূমির ১৫-১৬ শতাংশজুড়ে থাকা ঘন বনভূমি এখন একক অঙ্কের শতাংশে নেমে এসেছে।
টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: ১৯৮৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের প্রায় ৬৪ শতাংশ বন-আচ্ছাদন হারিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক বন এখন রূপ নিয়েছে ঝোপঝাড় আর কৃত্রিম বৃক্ষবাগানে।চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: একসময় হাতি, উল্লুক, সাম্বার, ধনেশ ও অজগরের নিরাপদ আবাসস্থল চুনতি আজ অবৈধ দখল, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
মধুপুরের ট্র্যাজেডি ও ‘সবুজ মরুভূমি’র দর্শন: ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাঠ উৎপাদন ও গ্রামীণ আয় বাড়লেও, এটি প্রাকৃতিক বনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী শালবন-যা একসময় শাল, জারুল, কদম, বহেরা ও আমলকীর মতো দেশীয় উদ্ভিদে সমৃদ্ধ ছিল, তা আজ আনারস, কলা, রাবার, একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাসের বাগানে পরিণত হয়েছে।
বাস্তুসংস্থানিক ক্ষতি: পরিবেশবিদরা একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাসকে “সবুজ মরুভূমি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও দেশীয় পাখি, কীটপতঙ্গ ও পরাগবাহীদের কোনো খাদ্য জোগাতে পারে না। প্রাকৃতিক বনের বহুতল শিকড়ব্যবস্থা মাটিতে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে যে ‘স্পঞ্জ’ তৈরি করে, এই মনোকালচার (একক প্রজাতির চাষ) বাগানে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।বন উজাড়ের প্রধান অনুঘটকসমূহসরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি অবৈধ দখলের আওতায় রয়েছে।
বন কমে আসার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ── জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও কাঠ পাচার, পার্বত্য অঞ্চলে জুম চাষের নামে প্রথাগত বন পোড়ানো এবং বহিরাগতদের বসতি স্থাপন, সড়ক, রেলপথ, শিল্পাঞ্চলসহ বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত পরিবেশগত চাপ।
নতুন জাতীয় বনদর্শনের সুযোগ: অঞ্চলভিত্তিক সমাধানএই ২৫ কোটি গাছ রোপণের মহাপরিকল্পনাটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কর্মসূচির সিংহভাগ গাছই হতে হবে দেশীয় ফলদ, ঔষধি, এবং বন্যপ্রাণীবান্ধব প্রজাতি।
২৫ কোটি গাছ রোপণের এই অভিযান কেবল বন বিভাগের রুটিন কাজ নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অস্তিত্বের লড়াই। আমরা যদি আবারও একাশিয়া বা ইউক্যালিপটাসের মতো সহজ ও বাণিজ্যিক পথে হাঁটি, তবে কাগজে-কলমে হয়তো সবুজায়ন বাড়বে, কিন্তু প্রকৃতি ভেতর থেকে আরও ফোকলা হয়ে যাবে। একমাত্র দেশীয় প্রজাতিনির্ভর এবং বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক বনায়নই পারে বাংলাদেশকে তার হারানো প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ফিরিয়ে দিতে।
জনপ্রশাসন/কেএ/১ জুলাই, ২০২৬
