রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করা এবং একটি পরিকল্পিত চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলা। কিন্তু স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সাড়ে ১৮ বছর পার হলেও, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা বলছে—ঢাকায় দূষণ কমলেও সাভার এলাকা এখন নতুন এক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে।
সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মিত হলেও এর পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের ফলে ঢাকা শহরের পরিবেশ কিছুটা স্বস্তি পেলেও, সাভারের ধলেশ্বরী নদী এখন হুমকির মুখে। নদীর পানি বিবর্ণ ও কালো হয়ে যাওয়া, তীব্র দুর্গন্ধ এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি স্থানীয় পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অকার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি): শিল্পনগরীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা ‘সিইটিপি’ এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিইটিপির ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে- অতিরিক্ত বর্জ্য প্রবাহ ও রাসায়নিকের অত্যধিক ব্যবহার। সিইটিপি লাইনে সরাসরি কঠিন বর্জ্য মিশে যাওয়া। বিদ্যুৎ সংকট ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ। দক্ষ জনবল ও উন্নত প্রযুক্তির অভাব।
ল্যাব টেস্টের ভয়াবহ চিত্র: আইসিডিডিআরবি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে সংগৃহীত পানির নমুনা ভয়ংকর দূষণের চিত্র তুলে ধরেছে। সিইটিপির আউটলেট থেকে নির্গত পানিতে রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (সিওডি) এবং জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি)-র মাত্রা অনুমোদিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বিশেষ করে, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO)-এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম থাকায় তা জলজ প্রাণীর টিকে থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমনকি বাইপাস ড্রেনগুলোতে ক্রোমিয়ামের মাত্রা এতটাই বেশি, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

ব্যবসায়ী ও কর্মীদের উদ্বেগ: জরিপে অংশ নেওয়া ট্যানারি কর্মী ও ব্যবসায়ীদের অধিকাংশের মতেই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। সিংহভাগ উত্তরদাতা মনে করেন, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের বর্তমান ব্যবস্থা আংশিক এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। শিল্পনগরীতে হাসপাতাল বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অভাবও কর্মীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সংকট: বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের প্রসারে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ অপরিহার্য। অথচ, পরিবেশগত অনুবর্তিতার ঘাটতি ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশ ট্যানারি এই সনদ অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি চামড়া তার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। প্রশাসনিক জটিলতা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের অভাব এবং কাঁচা চামড়ার বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব এই শিল্পকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞ সুপারিশ: আইএমইডির প্রতিবেদনে শিল্পনগরীর টেকসই উন্নয়নে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-বর্জ্য শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত সংস্কার ও নিয়মিত তদারকি। প্রতিটি কারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দূষণ নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু। এলডব্লিউজি সনদ পেতে একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিল্পনগরীর ভেতরে আধুনিক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু।
সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটিকে দেশের চামড়াশিল্পের আধুনিকায়নের একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হলেও, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার চরম গাফিলতি একে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। টেকসই চামড়াশিল্প গড়তে হলে কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়, বরং কঠোর তদারকি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। তা না হলে সাভারের পরিবেশগত বিপর্যয় ভবিষ্যতে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জনপ্রশাসন/কেএ/ জেডআরসি/২ জুলাই ২০২৬
