সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা: যন্ত্র আছে, চালানোর মানুষ নেই

সব আছে—বিশাল কারখানা, উৎপাদনের ইতিহাস আর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা। নেই শুধু প্রয়োজনীয় মানুষ আর আধুনিক চোখ। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ভেতরের চিত্রটা এখন ঠিক এমনই।

মালবাহী ওয়াগন আর যাত্রীবাহী কোচ পুনর্নির্মাণের সক্ষমতা থাকার পরও বছরের পর বছর ধরে অকেজো পড়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি। লোকবল সংকট, এনালগ প্রযুক্তি আর কাঁচামালের টানাপোড়েনে ভেস্তে যাচ্ছে নিজস্ব উৎপাদনের স্বপ্ন। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতি বছর দেশের ও বিদেশের বাজার থেকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনতে হচ্ছে সরকারকে, যার বড় একটি অংশের গুণগত মান নিয়ে রয়েছে তীব্র বিতর্ক।

শপজুড়ে অচল যন্ত্রের মিছিল ও মাকড়সার জালসম্প্রতি কারখানার বিভিন্ন উৎপাদন শপ ঘুরে দেখা যায় এক নিথর দৃশ্য। এই শপের ২৯টি হালকা ও ভারী মেশিনের অধিকাংশেই জমেছে ধূলার আস্তরণ, কোথাও কোথাও ঝুলছে মাকড়সার জাল।

দুটি শপ মিলে মোট ১৪২টি মেশিনের মধ্যে সচল মাত্র ৩৮টি। বাকি ১০৪টি মেশিন দীর্ঘদিন ধরে স্রেফ জঞ্জাল হয়ে পড়ে আছে। কারখানার ৭৭৯টি মেশিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭টি অচল। তবে যা সচল, তা-ও দক্ষ কারিগরের অভাবে পূর্ণ মেয়াদে চালানো যায় না।

মেশিন আছে ৫৮২, কারিগর মাত্র ১৪০!

সৈয়দপুর কারখানার মূল সংকট লুকিয়ে আছে এর মানবসম্পদে। যন্ত্রপাতি ৭৭৯টি। অচল মেশিন ১৯৭টি। সচল মেশিন৫৮২টি। সচল মেশিন চালানোর প্রয়োজনীয় দক্ষ কারিগর মাত্র ১৪০ জন। বিপুল সংখ্যক শূন্য পদের কারণে সচল মেশিনগুলোও অলস ফেলে রাখতে হচ্ছে, যা দিন দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থায়িত্ব হারাচ্ছে।

প্রাচীন যন্ত্রপাতির লড়াই ও প্রযুক্তির দেয়ালশুধু জনবল নয়, কারখানার অন্যতম প্রধান বাধা এর যন্ত্রপাতির বয়স। মোট মেশিনের ৪৮২টির বয়সই ৫০ বছরের বেশি।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

২০১৬ সালের পর চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা নতুন প্রযুক্তির কোচগুলোর খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরিতে প্রয়োজন আধুনিক সিএনসি (CNC – Computer Numerical Control) মেশিন। কারখানায় এই প্রযুক্তি না থাকায় আধুনিক কোচের যন্ত্রাংশ তৈরিতে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে কারিগরি দলকে।

সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয়

কারখানার উৎপাদন প্রকৌশলী মো. জাহিদ হাসান জানান, বর্তমানে কারখানায় ৬৪৩ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করা সত্ত্বেও প্রযুক্তি ও জনবল সংকটে প্রতি বছর বাইরে থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে কিনতে হয় প্রায় ২৫০ ধরনের যন্ত্রাংশ। এতে প্রতি বছর সরকারের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ কোটি টাকা। সীমাবদ্ধতার মাঝেও বর্তমান স্বল্প জনবল নিয়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮০টি ওয়াগন ও কোচ সংস্কার করা হচ্ছে, যা প্রমাণ করে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই কারখানা বদলে দিতে পারে বাংলাদেশ রেলওয়ের অর্থনীতি।

উত্তরণের পথ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত

কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক শাহ সুফি নূর মোহাম্মদের মতে, কারখানাটিকে পূর্ণ সচল করতে হলে তিনটি জায়গায় দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে- জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক সিএনসি (CNC) মেশিন সংযোজন। অনুমোদিত শূন্য পদে দ্রুত মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কারিগর নিয়োগ এবং উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে সময়মতো কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা।

শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর কারখানাকে সচল রাখা মানে কেবল পুরনো লোহালক্কড় মেরামত করা নয়; এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের আত্মনির্ভরশীলতার পথ। এখনই যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা না হয়, তবে এই সক্ষমতা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশীক মুদ্রা বাইরের বাজারে ঢালতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *