চুনতির বাঁশবাগান উধাও: খাদ্যসংকটে হাতির দল

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনে বন্য হাতির প্রধান খাদ্য উৎস ৮ একরের একটি ঐতিহ্যবাহী বাঁশবাগান উজাড় করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি সিন্ডিকেটের চক্রান্তে বনের প্রাকৃতিক বাঁশঝাড় কেটে ফেলে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বনজ গাছ লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে। এতে বুনো হাতির খাবার সংকট তীব্র হওয়ার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ঢুকে পড়ে মানুষ-হাতি সংঘাত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদ ও বন গবেষকেরা।

সরেজমিনে বনের বর্তমান চিত্র

উপজেলা সদর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে চুনতি হাজী রাস্তার মাথা থেকে কয়েক কিলোমিটার ভেতরে নয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই ‘বাঁশবাগান পাহাড়’। প্রায় ৮ একর বিস্তৃত এই পাহাড়ি বনাঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের বুনো হাতির নিয়মিত খাদ্য সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র ছিল।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের দক্ষিণ পাশের প্রায় এক একর এলাকার বাঁশ, বনজ গাছ ও লতাগুল্ম কেটে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। কাটা বাঁশ ও গাছের গুঁড়ি সরিয়ে নেওয়ার চিহ্ন এবং মাটি খোঁড়ার গর্ত এখনো দৃশ্যমান। উক্ত স্থানে বুনো হাতির সতেজ বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ প্রত্যক্ষ করা গেছে, যা প্রমাণ করে যে মাত্র কয়েক দিন আগেও কচি বাঁশ খেতে হাতির দল সেখানে এসেছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও সিন্ডিকেটের ভূমিকা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গত তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে এই বাঁশঝাড় কেটে বনজ গাছ রোপণ করা হচ্ছিল। সম্প্রতি স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি চক্র গত রোববার শ্রমিক দিয়ে পাহাড়ের একাংশ উজাড় করে বাঁশ বিক্রি করে দেয়। পুরো বাগানটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে সেখানে বাণিজ্যিক বাগান তৈরির পরিকল্পনা করছে চক্রটি।

তবে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য এলাকাটি চেনার কথা অস্বীকার করেন এবং পরবর্তীতে পুনরায় ফোন করা হলে তা ধরেননি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বন গবেষক ড. মো. কামাল হোসেন জানান, বাঁশ বুনো হাতির অত্যন্ত প্রিয় ও প্রয়োজনীয় খাদ্য। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এভাবে খাদ্যের প্রধান উৎস নষ্ট হলে বাধ্য হয়ে হাতির দল লোকালয় ও কৃষিজমিতে হানা দেবে, যা মানব-হাতি সংঘাতকে নতুন করে উসকে দেবে।

বন বিভাগের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি

চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের কর্মকর্তা বজলুর রশীদ জানান, ২০০৪ সালে বন বিভাগ নিজ উদ্যোগে এই বাঁশ বাগানটি তৈরি করেছিল। বাণিজ্যিকভাবে দখলদারদের রোপণ করা অবৈধ গাছগুলো দ্রুত অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হবে। একই সাথে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সেখানে পুনরায় বাঁশ রোপণ এবং জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনপ্রশাসন/কেএ/২৪ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *