মানুষ-হাতির প্রাণঘাতী দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত বনভূমি

বন উজাড়, পাহাড় দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের বনাঞ্চল এখন মানুষ ও হাতির এক প্রাণঘাতী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সংকুচিত বন, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং খাদ্য ও পানির চরম সংকটে দিশেহারা বন্য হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে নেমে আসছে। শুরু হচ্ছে বেঁচে থাকার এক নির্মম লড়াই, যেখানে প্রাণ দিতে হচ্ছে মানুষ ও হাতি—উভয় পক্ষকেই। কক্সবাজার-টেকনাফের চিরহরিৎ বনাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরের দুর্গম গারো পাহাড় পর্যন্ত এই ট্র্যাজেডি এখন নিয়মিত ঘটনা।

খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে হাতির পাল জঙ্গল ছেড়ে কৃষকের ফসলি জমি ও বসতবাড়িতে হানা দিচ্ছে। আতঙ্কিত মানুষ নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ বাঁচাতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ, বিষ মেশানো খাবার ও আগুনের মশাল ব্যবহার করছে। বন বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১২ বছরে দেশজুড়ে মানুষ-হাতির সংঘাতে অন্তত ৮৪টি বন্য হাতি এবং ৫৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলে ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়ের কারণে বনভূমির ওপর নজিরবিহীন চাপ পড়েছে। এক সময় উখিয়া-ঘুমধুম, তুলাবাগান-পানিরছড়া এবং নাইক্ষ্যংছড়ি-রাজারকুল—এই তিনটি ঐতিহাসিক করিডোর দিয়ে হাতিরা অবাধে চলাচল করত। আজ সেই প্রাচীন পথগুলো শরণার্থী শিবির, পিচঢালা সড়ক ও কংক্রিটের অবকাঠামো দিয়ে পুরোপুরি অবরুদ্ধ।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৫টি বন্য হাতি মারা গেছে, যার মধ্যে ৭টি মানুষের হাতে নিহত। একই সময়ে হাতির আক্রমণে আটজন গ্রামবাসী নিহত হয়েছেন।

বন বিভাগের তথ্যে অবৈধ দখলের একটি ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের প্রায় ৮ হাজার একর জমিতে ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবির রয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও আরও ১২ হাজার ৪২০ একর জমি ‘বেআইনিভাবে দখল’ করা হয়েছে। গত জুন মাস পর্যন্ত বন বিভাগ মাত্র ৪ হাজার ৮০০ একর জমি উদ্ধার করতে পেরেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আড়ালে স্থানীয় প্রভাবশালীদের এই বিপুল পরিমাণ বনভূমি দখল হাতির আবাসস্থলকে আরও সংকুচিত করে ফেলেছে।

অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের গারো পাহাড় এবং এর আশপাশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো এক জীবন্ত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও জামালপুরে আকস্মিক সংঘর্ষে ৪৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও বিষক্রিয়ায় ৩৫টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে কেবল শেরপুরেই ৩০ জন মানুষ ও ৩০টি হাতির মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে হাতির প্রাকৃতিক খাদ্যভাণ্ডার—বন্য কলাগাছ, বাঁশ, আমলকী ও বহেড়া ধ্বংস হয়ে গেছে।

সংকট সমাধানে বন বিভাগের নেওয়া উদ্যোগগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ২৭০ কেজি খাবার এবং ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। বন বিভাগ বালিজুড়ি রেঞ্জে ধারণক্ষমতার বাইরে থাকা ১২০টি হাতির জন্য মাত্র ১১৫ হেক্টর (প্রায় ২৮৪ একর) জমিতে বিশেষ চারণভূমি তৈরির কথা বলছে, যা হাতির প্রকৃত চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।

এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে হাতির তৃষ্ণা মেটাতে বনের গভীরে ৪০টি কৃত্রিম হ্রদ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বনের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে; উন্মুক্ত করিডোর না খুলে কেবল জলাধার বা নামমাত্র চারণভূমি তৈরি করাটা লোকদেখানো তৎপরতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

পরিবেশবাদীদের মতে, হাতিগুলো কোনো অপরাধ করছে না; তারা শুধু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা তাদের প্রাচীন পথ ধরেই হাঁটছে, যে পথগুলো মানুষ দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) দাবি, প্রাণঘাতী বৈদ্যুতিক ফাঁদ নিষিদ্ধ করা, বন টহল জোরদার করা এবং হাতির অবরুদ্ধ তিনটি প্রধান করিডোর পুনরায় খুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

খণ্ডিত ও জোড়াতালির এসব প্রকল্প দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সংযুক্ত বনভূমি, উন্মুক্ত করিডোর এবং জবরদখলকারীদের হাত থেকে বনকে মুক্ত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে মানুষ ও হাতির এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলতেই থাকবে। কারণ, মানুষ ও হাতি জন্মসূত্রে শত্রু নয়; তারা কেবল সংকুচিত হয়ে আসা ভূমির দখল নিয়ে লড়তে বাধ্য হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *