শিক্ষাক্রমে আসছে নতুন চার বিষয়, আইসিটি বইয়ে আমূল পরিবর্তন

বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্র ও জীবনযাত্রার খোলনলচে বদলে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বৈশ্বিক এই স্রোতের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশ সরকারও শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে পাঠ্যবইয়ে বড় পরিবর্তন এবং ২০২৮ সালে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম চালু হতে যাচ্ছে।

তবে শিক্ষাবিদ ও মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, ডিভাইস এবং শিক্ষকদের কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব দূর না করে কেবল সিলেবাসে এআই যুক্ত করলে তা শহরের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার্থীদের এক ভয়ংকর ডিজিটাল বৈষম্যের মুখে ঠেলে দেবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বই সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, মিডিয়া লিটারেসি, সাইবার নিরাপত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো আধুনিক বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।

প্রযুক্তি ছাড়াও ২০২৭ সাল থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামের নতুন চারটি বই যুক্ত হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক উইং) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু।

কেবল বিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে তোড়জোর শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম-বেইজড এডুকেশন (ওবিই), লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) এবং এআইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ২০ জুন এক সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও স্পষ্ট করেছেন যে, দেশের টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পের আধুনিকায়নে এআই-এর বিকল্প নেই এবং শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের এই যোগসূত্র তৈরিতেই কাজ করছে সরকার।

কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনা চমৎকার হলেও, বাস্তবতার জমিন বেশ রুক্ষ। যেখানে দেশের অনেক গ্রামীণ স্কুলে এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নেই, সেখানে ‘ক্লাউড কম্পিউটিং’ বা ‘রোবোটিক্স’ কেবল বইয়ের পাতায় মুখস্থ করার বিষয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রহমত উল্লাহ মাঠপর্যায়ের রূঢ় সত্যটি তুলে ধরে বলেন, “গ্রামের অনেক শিক্ষক এখনও ঠিকমতো স্মার্টফোনই ব্যবহার করতে পারেন না। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য নেই। এই অবস্থায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছাড়া এআই চালু করলে শহরের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার্থীদের এক বিশাল ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হবে।”

প্রযুক্তির জোয়ারে শিক্ষকের ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। এআই-এর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশুদের মৌলিক চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “মেশিন কখনোই মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের চিন্তাশক্তি কমে যায় এবং মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। অস্ট্রেলিয়া বা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলো এর ক্ষতিকর প্রভাব সামলাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনছে। আমাদের শ্রেণিকক্ষে মানবিকতার জায়গাটি টিকিয়ে রাখতে হবে।”

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, এআই কখনোই শিক্ষকের বিকল্প নয়। এটি কেবল সহায়কমাত্র। এর সুফল পেতে হলে শিক্ষকদের ইন্টারনেট, ডিভাইস প্রদান ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

২০২৭ সালের শিক্ষা সংস্কার কেবল নতুন মোড়কে আইসিটি বই ছাপানোর বিষয় নয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের কারিগরি অবকাঠামো নিশ্চিত না করে সিলেবাস ভারী করা হলে, তা দিনশেষে কেবল বইয়ের প্রকাশকদেরই লাভবান করবে, শিক্ষার্থীদের নয়। সরকারের মূল পরীক্ষা এখন সিলেবাস প্রণয়নে নয়, বরং দেশব্যাপী অবকাঠামোগত বৈষম্য দূর করার সদিচ্ছায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *