দীর্ঘ এক দশকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দরকষাকষির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড)। সোমবার (২৭ জুলাই) কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে ৭৮৩ একর জমির ওপর প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলো।
তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন শুরু হতে অপেক্ষা করতে হবে আরও অন্তত ছয় মাস। আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চলটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) সঙ্গে একটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এক দশকের গোলকধাঁধা ও ডেভেলপার বদল
এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল এক যুগ আগে। ২০১৪ সালে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলেও প্রকল্প আর এগোয়নি।
শুরুতে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) ডেভেলপার হিসেবে নিয়োগের কথা থাকলেও শর্ত ও চুক্তির বনিবনা না হওয়ায় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে সিআরবিসি-র সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটিতে ফের গতি এসেছে।

অর্থায়ন ও অবকাঠামো
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ‘প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট’ (পিবিসি) সুবিধার আওতায় বৈদেশিক ঋণ সহায়তা আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা আসবে সরকারি কোষাগার থেকে।
এই বিপুল বাজেটের আওতায় আনোয়ারায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে থাকছে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন এবং বিদ্যুৎ সাবস্টেশন। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় অঞ্চলটি দেশের অন্যতম প্রধান লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় বৈরব ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, ‘এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়িত হলে এলাকার বেকারত্ব কমবে। আমরা চাই চাকরির ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো, শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ লক্ষ্যে আনোয়ারা উপজেলায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল গড়ে উঠছে।’
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক এই শিল্পাঞ্চলে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সেই অনুযায়ী কারিগরি দক্ষতা না থাকলে এই ‘এক লাখ কর্মসংস্থান’-এর সুবিধা বিদেশিরাই নিয়ে যাবে।
জনপ্রশাসন/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৭ জুলাই ২০২৬
