বৈশ্বিক ই-কমার্স, ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং এবং ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নতুন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে ‘ব্যাংক-ইন্টারমিডিয়েটেড বা ব্যাংক-মধ্যস্থতাকারী আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল পেমেন্ট কাঠামো’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই নির্দেশনার ফলে দেশীয় অনুমোদিত ডিলার (AD) ব্যাংকগুলো পেপল (PayPal), পেওনিয়ার (Payoneer) কিংবা স্ট্রাইপ (Stripe)-এর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারবে।
কী এই ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট’ (DVA) এবং এটি কীভাবে কাজ করবে?
নতুন এই নীতিমালার অন্যতম উদ্ভাবনী দিক হলো ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট’ (DVA)-এর প্রবর্তন। এটি সাধারণ কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সংমিশ্রণে তৈরি একটি ব্যাংক-নিয়ন্ত্রিত ভার্চুয়াল ওয়ালেট।
মাস্টার ডিভিএ (Master DVA): সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক একটি কেন্দ্রীয় বা মূল সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করবে।
সাব-অ্যাকাউন্ট (Sub-Account): সাধারণ পাসপোর্টধারী, পর্যটক বা ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিপর্যায়ের ওয়ালেটটি এই মূল মাস্টার ডিভিএ-এর অধীনস্থ সাব-অ্যাকাউন্ট হিসেবে সংযুক্ত থাকবে।
ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব সিস্টেমে প্রতিটি ডিভিএ হিসাবের একটি সমান্তরাল খতিয়ান বা ‘মিরর লেজার’ (Mirror Ledger) তৈরি করে সংরক্ষণ করতে হবে। রিয়েল-টাইম মনিটরিং নিশ্চিত করার ফলে অর্থ পাচার ও অননুমোদিত লেনদেন রোধ করা সহজ হবে। কোনো অব্যবহৃত তহবিল থাকলে তা ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কে কোন সুবিধা পাবেন: বিস্তারিত নির্দেশিকাবাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এই কাঠামোর অধীনে লেনদেনের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে:সুবিধাভোগী/খাতব্যবহারের সুযোগ ও লেনদেন সীমাসাধারণ গ্রাহক ও পর্যটকবার্ষিক পাসপোর্ট কোটা (Travel Entitlement)-এর আওতায় চিকিৎসা, ভ্রমণ ও দাপ্তরিক কাজে সরাসরি ওয়ালেট ব্যবহারে ব্যয়।
ছোটখাটো আন্তর্জাতিক কেনাকাটা বা অনলাইন ফি পরিশোধে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয়।ফ্রিল্যান্সার ও ই-কমার্সআন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্জিত অর্থ কোনো জটিলতা ছাড়াই দ্রুত দেশে আনার সুবিধা।রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানERQ (Export Retention Quota) ও RFCD হিসাব থেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ৩ জন শীর্ষ কর্মকর্তা বিদেশে বাণিজ্যিক কাজে ওয়ালেট ব্যবহার করতে পারবেন।বিদেশি পর্যটক (Non-resident)বাংলাদেশে আগত বিদেশি নাগরিক বা পর্যটকরা দেশের স্থানীয় মার্চেন্ট পয়েন্ট ও দোকানপাটে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপনের ৩টি প্রধান লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাবপেমেন্ট অবকাঠামোর আধুনিকায়ন: এর আগে ব্যাংকগুলো মূলত ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স আনার কাজে গেটওয়ে ব্যবহার করত। নতুন নীতিমালায় বৈদেশিক আউটওয়ার্ড ও ইনওয়ার্ড দুই ধরনের পেমেন্টই এখন একটি আধুনিক আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আসবে।
গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে আকৃষ্ট করা: সরাসরি চুক্তি ও নিরাপদ ব্যাংক-মধ্যস্থতাকারী মডেল প্রবর্তনের ফলে পেপল বা পেওনিয়ারের মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বাংলাদেশ নিয়ে বাণিজ্যিক কাজ সহজ হবে।
অনলাইন সার্ভিস বাণিজ্যের বিস্তার: আইটি সেবা প্রদানকারী, মেম্বারশিপ ফি, ভিসা প্রসেসিং এবং গ্লোবাল হোটেল বুকিং সহজ হওয়ায় দেশের সেবা খাত বা সার্ভিস এক্সপোর্টের গতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত: যেসব ব্যাংক এই আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবা চালু করতে আগ্রহী, তাদের কারিগরি অবকাঠামো, আইনি কাঠামো ও সিকিউরিটি সিস্টেম বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগে জমা দিয়ে পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
এছাড়াও অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (AML) এবং কেওয়াইসি (KYC) নির্দেশনা শতভাগ পালন নিশ্চিত করতে হবে।
জনপ্রশাসন/কেএ/ ২৯ জুলাই ২০২৬
