হাজার মিটার উচ্চতার ‘জেদ্দা টাওয়ার’: মরুর বুকে নতুন বিস্ময়

রোদঝলমলে এক পড়ন্ত বিকেলে লোহিত সাগরের নীল জলরাশির দিকে তাকালে এখন শুধু ঢেউয়ের দোলা চোখে পড়ে না, চোখে পড়ে এক অবিশ্বাস্য মানবস্বপ্নের উত্থান। মরুর তপ্ত বালুকারাশি ভেদ করে আকাশের দিকে ডানা মেলছে এক প্রকাণ্ড বিমূর্ত ভাস্কর্য—‘জেদ্দা টাওয়ার’।

ইতিহাসের পাতায় কোনো এক যুগে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা (৮২৮ মিটার) যখন ৮২৮ মিটারের বিস্ময় নিয়ে মেঘের দেশে রাজত্ব শুরু করেছিল, পৃথিবী ভেবেছিল উচ্চতার সীমানা হয়তো সেখানেই শেষ। কিন্তু মানুষ যে অসীমের অনুরাগী! সেই সীমানাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতেই সৌদি আরবের বুকে জন্ম নিচ্ছে এক কিলোমিটারেরও (১,০০০ মিটার+) বেশি উঁচু এই নতুন বিস্ময়।

মরুভূমির অঙ্কুর থেকে জন্ম নেওয়া এক মহাকাব্য: এই ভবনের স্থাপত্য নকশায় রয়েছে এক অদ্ভুত নান্দনিক কাব্যতা। শিকাগোর বিশ্বখ্যাত স্থপতিদের হাতে যখন এর রূপরেখা তৈরি হয়, তারা অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন মরুভূমির রুক্ষ বুকে জীবনের বার্তা নিয়ে জেগে ওঠা এক চারাগাছের অঙ্কুরিত পাতায়।

বাতাসের সাথে সুরের মেলবন্ধন: নিচ থেকে প্রকাণ্ড হয়ে ওপরে উঠতে উঠতে ভবনটি ডালপালার মতো সরু ও সূক্ষ্ম হয়ে মিশে গেছে শূন্যে। এই ট্যাপার্ড আকৃতি ওপরের ক্ষিপ্ত বাতাসকে আঘাত করার সুযোগ দেয় না, বরং বাতাসকে আলতো করে কেটে বেরিয়ে যাওয়ার পথ করে দেয়।

স্থিতিশীলতার ত্রিমুখী শিকড়: বুর্জ খলিফার মতোই এর ইংরেজি ‘Y’ আকৃতির তিন পাখাবিশিষ্ট ভিত্তি ভবনটিকে মাটির গভীরে এমনভাবে আটকে রেখেছে, যেন শত ঝড়ও এর শক্তিমত্তাকে টলাতে না পারে।

থমকে যাওয়া সময়ের পুনর্জাগরণ: ২০১৩ সালে যখন প্রথম এই স্বপ্ন বুনেছিলেন প্রিন্স আল-ওয়ালিদ বিন তালাল, কাজ এগিয়েছিল দ্রুত। কিন্তু ২০১৮ সালে হঠাৎ করেই এক বিষাদের সুর নেমে আসে; থামকিয়ে দেওয়া হয় এর নির্মাণকাজ। বালুর ঝড়ে ঢেকে যেতে বসেছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন।

তবে মহৎ স্বপ্ন কখনো চিরতরে ঘুমায় না। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর নতুন ভোরের ছোঁয়ায় ২০২৫ সালে আবার জাগ্রত হয় এই রূপকথা। সম্প্রতি প্রিন্স আল-ওয়ালিদ যখন ৪৩০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখলেন—“আল্লাহর রহমতে কাজ চলছে এবং আমরা তৈরি করব বিশ্বের সর্বোচ্চ টাওয়ার”—তখন বিশ্ব স্থাপত্যপ্রেমীদের হৃদয় আবার স্পন্দিত হয়ে ওঠে। মোট কাজের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন দৃষ্টিগোচর, আর ২০২৮ সালের মধ্যেই নাকি মেঘের ওপর পা রাখবে এই অট্টালিকা।

লোহিত সাগরের ওপর ভাসমান এক রাজপ্রাসাদ: ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মূল টাওয়ার আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ২০ বিলিয়ন ডলারের ‘জেদ্দা ইকোনমিক সিটির’ বুক চিরে যখন এই টাওয়ার পূর্ণতা পাবে, তখন সেখানে শুধু ইট-পাথর থাকবে না; থাকবে মানুষের বিলাসিতার চরম পরাকাষ্ঠা।

মেঘের গালিচা মাড়িয়ে আপনি উঠবেন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু অবজারভেশন ডেকে। সেখান থেকে লোহিত সাগরের অফুরন্ত নীল জলরাশি আর সূর্যাস্তের রক্তিম আভা যখন আপনার চোখে এসে পড়বে, মনে হবে পৃথিবীটা সত্যিই হাতের তালুতে এসে জমেছে! বিলাসবহুল হোটেল, শূন্যে ভেসে থাকা আবাসিক ডেরা আর আলোঝলমলে করপোরেট দুনিয়া—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠবে এক নতুন রূপকথার রাজত্ব।

সৌদি আরব কেবল তেল বিক্রি করা অর্থনীতির খোলস ছেড়ে নতুন এক ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছে। আর সেই রূপান্তরের অগ্রভাগে ধ্বজা উড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে ‘জেদ্দা টাওয়ার’—যা কেবল লোহার কাঠামোর কোনো দালান নয়, বরং মানুষের অধরাকে স্পর্শ করার চিরন্তন তৃষ্ণার এক উজ্জ্বল প্রতীক!

জনপ্রশাসন/কেএ/ ২৯ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *