উপকূলে থামল লোনাপানির কান্না, ‘জলদাস’দের প্রত্যাবর্তন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে একসময় যে বাতাসের দাপট ছিল, তাতে মিশে থাকত পোড়া তেলের কটু গন্ধ আর ভারী ধাতুর বিষাক্ত নিঃশ্বাস। সেখানে পাহাড়ের চূড়া নয়, বরং দিগন্তরেখা ছিল বিশাল বিশাল জাহাজের কঙ্কাল দিয়ে ঘেরা। কিন্তু আজ সেই চেনা দৃশ্যপট বদলেছে।

বিষাক্ত গ্রিজের পরিবর্তে বালুচরে এখন সবুজের ছোঁয়া, আর কলকারখানার অমানবিক শব্দ ছাপিয়ে কান পাতলে শোনা যায় সমুদ্রের আদিগন্ত গর্জন। বছরের পর বছর ধরে চলা মরণব্যাধি দূষণ কাটিয়ে প্রকৃতি যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, আর সেই সাথে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নিজেদের শিকড়ে ফিরছেন সীতাকুণ্ডের ‘জলদাস’রা।

লোহা আর রক্তের হিসাবের দিনশেষ: একসময় সীতাকুণ্ডের উপকূলে ১৫০টিরও বেশি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল। হাজার হাজার অদক্ষ শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে সস্তা লোহা উৎপাদন ছিল এখানকার নিয়মিত চিত্র। সেখানে একটি হাতের বা চোখের মূল্য নির্ধারিত হতো সামান্য কিছু টাকায়। তবে সময়ের পরিবর্তনে এখন সেই রমরমা অবস্থার ইতি ঘটেছে।

ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)-এর কঠোর নিয়মকানুনের বেড়াজালে এখন সীতাকুণ্ডে টিকে আছে মাত্র ১৭টি ইয়ার্ড। আগে যেখানে জাহাজের ভিড়ে সূর্য দেখা যেত না, সেখানে এখন দিগন্ত অনেকটা মুক্ত।

‘জলদাস’দের ঘরে ফেরা: হরিকমলের জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে জাহাজের লোহা কাটার শব্দে। ১৯৯১ সালের সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে পরিবার হারিয়ে তিনি সমুদ্রের বুক থেকে সরে এসেছিলেন জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডে। তার ভাষায়, “যে সমুদ্র আমার সব কেড়ে নিয়েছিল, সেই সমুদ্রকেই আবার আমরা বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে ধ্বংস করছিলাম।”

তবে হরিকমলের মতো শত শত মানুষ এখন আর ইয়ার্ডের ধোঁয়াটে জীবনে নেই। নিয়ম মেনে ইয়ার্ডগুলো চলায় এখন পরিবেশের বিপর্যয় কমেছে, সাগরের মাছ ফিরতে শুরু করেছে। বেকারত্ব হরিকমলের জীবনে অভিশাপ হয়ে আসেনি, বরং আশীর্বাদ হয়ে এনেছে তার পূর্বপুরুষের পেশা—মাছ ধরা। বাঁশি দাসের মতো স্থানীয় জেলেরা এখন আবারও জাল ফেলছেন লোনাজলে। মাছ ধরা পড়ছে, আর সেই মাছের গন্ধে আবার সরগরম হয়ে উঠছে উপকূলের জীবন।

বিজ্ঞান বলছে নতুন ভোরের কথা: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলামের মতে, বাস্তুতন্ত্রের এই পুনরুদ্ধার কোনো অলৌকিক বিষয় নয়।

তিনি বলেন, “দূষণের লাগাম টেনে ধরার ফলেই উপকূলের প্রজাতিগুলো আবার টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রাতারাতি ফেরে না, কিন্তু সীতাকুণ্ডের এই ইতিবাচক পরিবর্তনটি দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।”

উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞা: অবশ্য এই পরিবর্তনের মূল্যও দিতে হয়েছে। জাহাজ আমদানির হার কমেছে, অর্থনীতির গতি মন্থর হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা পড়ছেন ক্ষতির মুখে। তবুও এক সময়ের ‘মরণফাঁদ’ থেকে মুক্তি পাওয়া স্থানীয়দের কাছে এই পরিবর্তনই বড় স্বস্তি। এখন এখানে আর মৃত্যুর মিছিল নেই, বরং আছে নিয়ম মেনে চলার শৃঙ্খলা।

সীতাকুণ্ডের এই রূপান্তর নতুন এক আশার কথা শোনায়—উন্নয়ন মানেই ধ্বংস নয়, বরং পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলাই আসল অগ্রগতি।

হরিকমলরা জানেন, শিল্প হয়তো চিরকাল থাকবে না, কিন্তু প্রকৃতি আর তার আদি পেশা ‘জলদাস’ হয়ে টিকে থাকাটাই তাদের জীবনের পরম সত্য।

জনপ্রশাসন/কেএ/৪ জুলাই২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *