শিশুদের সুস্থ ও প্রাণবন্ত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে শাকসবজির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে অনেক বাবা-মায়ের জন্যই শিশুকে সবজি খাওয়ানোটা এক মহা যুদ্ধ জয়ের শামিল! বিজ্ঞান বলছে, জোর করে নয়, বরং কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করলেই এই সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব।
মেলিসা হোগেনবুমের বিশেষ গবেষণামূলক নিবন্ধের ওপর ভিত্তি করে, শিশুদের একঘেয়ে খাবার বা “বেইজ” ডায়েট থেকে বের করে পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত করার ৬টি বৈজ্ঞানিক ও জাদুকরী উপায় নিয়ে বিবিসির বিশেষ প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করা হলো।
জোর করে নয়, কৌশলে বাড়ুক শিশুর সবজিপ্রীতি: শিশুর বয়স ৫ বছর হওয়ার আগেই তার মুখের স্বাদ বা টেস্ট বাড উন্নত হতে শুরু করে। তাই প্রাক-বিদ্যালয় বা প্রিস্কুল পর্বটিই নতুন নতুন স্বাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
ধৈর্যের পরীক্ষা: কোনো সবজি প্রথমবার দেখেই শিশু মুখ ফিরিয়ে নিলে হাল ছাড়বেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নতুন সবজি পছন্দ করার আগে শিশুকে অন্তত ৫ থেকে ১৫ বার সেটি মুখে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
একটি মজার তথ্য: শিশুর খাবারের পছন্দের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময় থেকেই। গর্ভাবস্থায় মা যে ধরনের খাবার খান, শিশু গর্ভেই সেই স্বাদের সাথে পরিচিত হতে শুরু করে।
ক্ষুধার মুহূর্তে সবজির জাদু: শিশুকে কখনো বলবেন না, এটা খাও, শরীর ভালো থাকবে বা এটা স্বাস্থ্যকর। বরং বলুন, দেখো, এটা কত সুস্বাদু! শিশুরা ‘স্বাস্থ্যকর’ শব্দের চেয়ে ‘সুস্বাদু’ শব্দে বেশি আকৃষ্ট হয়।
ক্ষুধার সুযোগ নিন: রাতের প্রধান খাবার পরিবেশনের আগে, যখন শিশুর সবচেয়ে বেশি ক্ষুধা পায়, তখন প্লেটে প্রথমে সবজি দিন। চারপাশে অন্য কোনো চর্বিযুক্ত বা আকর্ষণীয় খাবার থাকলে শিশু স্বাভাবিকভাবেই সবজি এড়িয়ে চলবে।
সকালের চমক: সকালের নাস্তায় ডিমের অমলেট কিংবা মাফিনের ভেতরে সুক্ষ্মভাবে পালং শাক বা গাজর মিশিয়ে তৈরি করতে পারেন পুষ্টিকর নাস্তা।
প্লেটের অনুপাত ও স্বাধীনতার খেলা: শিশুর প্লেটে উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে সবজির পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। মানুষ সাধারণত প্লেটে যা দেখে, অবচেতনভাবেই সমপরিমাণ খাবার খেয়ে ফেলে।
লুকিয়ে বা মিশিয়ে দিন: যদি শিশু সবজি সরাসরি দেখতেই না চায়, তবে গাজর, পেঁপে বা ধুন্দুল কুচি করে ব্লেন্ড করে তরকারির গ্রেভি বা পাস্তার সসের সাথে মিশিয়ে দিন।
পছন্দের স্বাধীনতা: টেবিলে দুটি ভিন্ন সবজি রেখে শিশুকে জিজ্ঞেস করুন, “তুমি কোনটা নেবে?” এতে শিশু নিজেকে স্বাধীন মনে করে এবং নিজের পছন্দের খাবারটি আনন্দের সাথে খায়।
রূপের ছটায় খাবারের আকর্ষণ: শিশুরা চোখের দেখায় খাবার পছন্দ করে। সাধারণ সবজিকে যদি প্রজাপতি, ফুল, তারা কিংবা কার্টুন চরিত্রের আকারে কেটে প্লেটে সাজানো যায়, তবে তারা নিজে থেকেই তা খেতে আগ্রহ প্রকাশ করবে।
স্মার্ট প্লেটিং: বিজ্ঞান বলছে, থালায় সব খাবার একসাথে না মিশিয়ে যদি আলাদা আলাদা বাটিতে বা খোপ কাটা প্লেটে সুন্দর করে গুছিয়ে দেওয়া হয়, তবে শিশুরা অনেক বেশি পরিমাণে সবজি গ্রহণ করে।

পারিবারিক মেলবন্ধন: শিশুরা মূলত বাবা-মায়ের প্রতিচ্ছবি। আপনি নিজে যদি প্লেটে আগ্রহ নিয়ে সবজি তুলে না নেন, তবে শিশুকে তা খাওয়ানো অসম্ভব। তাই টেবিলে নিজে সবজি খেয়ে আদর্শ উদাহরণ তৈরি করুন।
পারিবারিক ডিনার: সপ্তাহে অন্তত তিনবার পরিবারের সবাই একসাথে বসে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। এটি শিশুর শুধু পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাসই গড়ে তোলে না, বরং তার মানসিক বিকাশ ও শারীরিক গঠনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
খাবার টেবিল হোক আনন্দের মঞ্চ: সবজি শেষ করলে চকোলেট দেব”—এই জাতীয় চুক্তি বন্ধ করুন। এতে সবজির প্রতি শিশুর অনীহা আরও বেড়ে যায়। প্লেটের সব খাবার শেষ করার জন্য কখনোই জোর করবেন না।
স্পর্শ ও অনুভূতির খেলা: নতুন কোনো সবজি (যেমন: বিট বা ব্রকলি) রান্নার আগে শিশুকে হাত দিয়ে ধরতে দিন, শুঁকতে দিন। খেলার ছলে নতুন খাবারের প্রতি তাদের ভয় ও জড়তা কেটে যায়।
খুদে শেফ: রান্নার ছোটখাটো কাজে (যেমন: সবজি ধোয়া বা সালাদ সাজানো) শিশুকে সাথে রাখুন। নিজের হাতে তৈরি করা খাবারের প্রতি শিশুদের এক অদ্ভুত আকর্ষণ থাকে, যা তারা আগ্রহ নিয়ে চেখে দেখতে চায়।
শিশুর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা কোনো এক রাতের যুদ্ধ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ধৈর্যের যাত্রা। জোর-জবরদস্তি বাদ দিয়ে প্রতিদিনের খাবার টেবিলে একটু সৃজনশীলতা আর ভালোবাসার ছোঁয়া দিলেই আপনার শিশু হয়ে উঠবে পুষ্টিগুণে ভরপুর ও স্বাস্থ্যবান।
জনপ্রশাসন/কেএ/১ জুলাই, ২০২৬
