দেশের অন্তত ১৮টি জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অবিরাম ঢুকছে ইয়াবা, হেরোইন, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা এই মাদকের প্রধান গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’-এর তথ্য বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক প্রবেশের রুট ও পয়েন্টগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জানা থাকলেও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। উল্টো প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে এই চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অরক্ষিত তিন করিডোর
ডিএনসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত তিনটি করিডোর দিয়ে দেশে মাদক ঢুকছে। ভারতের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত ব্যবহার করে আসছে ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইন। এর প্রবেশপথ হিসেবে যশোর, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, সিলেটসহ ১২টি জেলাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে (কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, ঘুমধুম, সেন্টমার্টিন ইত্যাদি) ঢুকছে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম জানান, ইয়াবা চোরাচালানে প্রায়ই রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে জব্দ হওয়া মাদকের বড় অংশই এখন ইয়াবা।
লক্ষ্য ঢাকা, ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম
মাদকের এই বিশাল চালানের প্রধান লক্ষ্য ঢাকার গ্রাহক। কারণ হিসেবে এ কে এম শওকত ইসলাম বলেন, যেখানে জনসংখ্যা ও টাকার প্রবাহ বেশি, মাদক চোরাকারবারিরা তাকেই বাজার হিসেবে বেছে নেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিএনসির তথ্যমতে, দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মাদকাসক্তের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখই ঢাকায়।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এলএসডি ও এমডিএমএর মতো সিনথেটিক মাদকের দিকে ঝুঁকছে তরুণরা। এসব রাসায়নিক মাদকের ব্যবহারকারী ও কারবারিদের বড় অংশের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
বদলেছে কৌশল, ডিজিটাল হচ্ছে চোরাচালান
চোরাকারবারিরা এখন আর কেবল সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা সাংকেতিক নামের ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করে মাদকের লেনদেন গোপন রাখছে। ডিজিটাল পেমেন্ট ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে চালান। আর সরাসরি বহনের ক্ষেত্রে জুতার ভেতর, গাড়ির টায়ার এমনকি নারী ও শিশুদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডিএনসির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ইয়াবাসহ অন্যান্য এমফিটামিন ট্যাবলেট জব্দের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪ কোটি ৩৫ লাখে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ।

সরবরাহ দ্বিগুণ হওয়ার এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের দাবি, ইয়াবা গডফাদার আবদুর রহমান বদির পর নতুন কোনো মাদকসম্রাটের উত্থান না হওয়াটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘সাফল্য’। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, গডফাদারের অনুপস্থিতিতে মাদকের চালান দ্বিগুণ হলো কীভাবে?
একইভাবে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম মাদক চোরাচালান দমনে স্থানীয় অপরাধী চক্র ও ‘অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর’ অসহযোগিতাকে দায়ী করেছেন। তবে এসব প্রভাবশালীর নাম তিনি স্পষ্ট করেননি।
সর্ষের ভেতরেই কি ভূত?
সংশ্লিষ্টদের এই ‘সক্ষমতার অভাব’ ও ‘প্রভাবশালীদের চাপ’-এর অজুহাত মানতে নারাজ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ মাদক প্রবেশের পয়েন্টগুলো সম্পর্কে জানে। যেসব পয়েন্ট দিয়ে চোরাচালান হচ্ছে, সেগুলো জানা থাকলে বন্ধ হচ্ছে না কেন? অস্বীকার করার উপায় নেই যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও অসততার কারণেই এমন অপরাধ চলতে থাকে। মাদকে বিপুল অর্থ জড়িত এবং টাকা দিয়ে মানুষকে কিনে নেওয়া যায়।
নতুন আইনে কি বদলাবে পরিস্থিতি?
ডিএনসি দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতির কথা বলে এলেও, গত ১৬ জুলাই ২০২৬ থেকে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ কার্যকর হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সংশোধিত আইনের আওতায় ডিএনসির নিজস্ব সাইবার ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড থাকবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল আইন ও সরঞ্জাম বাড়ালেই মাদকের ঢল থামবে না; এর জন্য প্রয়োজন সীমান্তে কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
জনপ্রশাসন/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৭ জুলাই ২০২৬
