কুঠারের মুখে ইতিহাস: জনস্বার্থ নাকি কাঁচা টাকা?

যে গাছ দাঁড়িয়েছিল ইতিহাস হয়ে, তাকেই ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিক্রির তালিকায়। ঝুঁকির অজুহাত দেখিয়ে সৈয়দপুরের শতবর্ষী ৩৩টি প্রাচীন গাছ কেটে ফেলার আয়োজন প্রায় চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভেতরের সরকারি নথি ফাঁস হতেই বেরিয়ে এলো আসল সত্য—গাছ কাটার পেছনে মূল উদ্দেশ্য জননিরাপত্তা নয়, বরং সেগুলোর বাণিজ্যিক মূল্য! তবে গণমাধ্যমের নজরদারি ও প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী হস্তক্ষেপে শেষ রক্ষা হয়েছে শতবর্ষী এ স্মৃতিচিহ্নগুলোর।

নথির সত্য বনাম বন কর্মকর্তার সাফাই

ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে কাটার তোড়জোড় চললেও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত নথিতে লেখা ছিল ভিন্ন কথা। সেখানে গাছগুলোর ‘পরিপক্বতা, বাণিজ্যিক উপযোগিতা ও আর্থিক মূল্য’ বিবেচনা করে সেগুলোকে ‘কর্তনযোগ্য’ বলা হয়। ৩৩টি বৃক্ষের সম্মিলিত বাজারদর ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৯৬ টাকা। শুধু তা-ই নয়, কাটা গাছ পরিবহনের জন্য সরকারি বিধিমালা অনুসরণেরও নির্দেশ দেন তিনি।

বিতর্কের মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তা দাবি করেন, তিনি শুধু ‘কর্তনযোগ্য’ বলেছেন, কাটার ‘অনুমোদন’ দেননি। তবে কাটার নির্দেশ না থাকলে কেন পরিবহনের তোড়জোড় ও দরদাম কষা হলো—সে প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি।

যেভাবে ভেস্তে গেল পরিকল্পনা

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের। পরবর্তীতে সরকারের সরাসরি নির্দেশনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গাছ কাটার সিদ্ধান্ত ও নিলাম স্থগিত ঘোষণা করে। সিদ্ধান্ত বাতুলের পর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রাচীন গাছগুলোর ক্ষতি না করে এখন থেকে সেখানে নতুন ৫ হাজার গাছের চারা রোপণের সামাজিক বনায়ন উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্মৃতির সৈয়দপুর ও দেশজুড়ে গাছের মহোৎসব

১৮৭০ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা সৈয়দপুরের সৌন্দর্য ও ইতিহাসের অন্যতম নীরব সাক্ষী এই বট, রেইনট্রি, নিম ও আমগাছগুলো। অথচ উন্নয়ন আর বাণিজ্যিক অজুহাতে এসব প্রাচীন গাছ উজাড় করা যেন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একটি পরিবেশবাদী গবেষণার তথ্যমতে, গত দুই বছরেই (২০২৩-২০২৫) সরকারি নানা প্রকল্পের নামে দেশজুড়ে কেটে ফেলা হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ গাছ।

না কেটেও যেভাবে বাঁচানো সম্ভব

বিশেষজ্ঞ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, শতবর্ষী গাছ মানেই তা বিপজ্জনক নয়। যান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে এগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। সেগুলো হচ্ছে- সব ডাল না কেটে শুধু বিপজ্জনক অংশগুলো ছাঁটাই করে গাছের ভারী অংশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। ঝুঁকে পড়া ভারী ডালের নিচে কাঠ বা ধাতব খুঁটি বসানো এবং কাণ্ডে প্যাঁচযুক্ত ইস্পাতের রড ব্যবহার করে সেটিকে ধরে রাখা। গাছের গোড়ার মাটির উর্বরতা বাড়াতে আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা।

জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে প্রাচীন প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের পথ না খুঁজে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলোকে শত বছর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব—সৈয়দপুরের ঘটনাটি তারই এক বড় প্রমাণ।

জনপ্রশাসন/ কেএ /২৮ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *