সোডা, চিনি আর তেলের ‘সাদা বিষে’ স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে

কৃষিখাতে ‘সাদা সোনা’ (চিংড়ি) কিংবা ‘কালো সোনা’ (পেঁয়াজের বীজ)—শব্দগুলোর সাথে দেশের মানুষ বেশ পরিচিত। তবে এই তালিকার পেছনে যুক্ত হয়েছে এক ভয়াবহ নতুন সংযোজন—‘সাদা বিষ’। যা দেখতে হুবহু দুধের মতো হলেও, তাতে নেই দুধের এক ফোঁটাও।

সোডা, চিনি, সয়াবিন তেল, লবণ, ডিটারজেন্ট এবং নানা ক্ষতিকর কেমিক্যালের বিষাক্ত মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে এই নকল তরল। মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে নামীদামি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা—সবখানেই অবাধে সরবরাহ করা হচ্ছে এই প্রাণঘাতী খাদ্য। অথচ জনস্বাস্থ্যের ওপর এমন ভয়াবহ হামলার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপ কেবল নামমাত্র জরিমানা ও গতানুগতিক ‘আশ্বাসে’ই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

যেভাবে তৈরি হচ্ছে এই বিষ: যে বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবকল্যাণ, তা এখন অসাধু চক্রের হাতে রূপ নিয়েছে প্রাণ হরণের হাতিয়ারে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা নকল দুধের কারখানাগুলোতে কয়েকভাবে ভেজাল মেশানো হয়।

আংশিক ভেজাল: অল্প পরিমাণ খাঁটি দুধের সাথে পানির মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুধের ঘনত্ব ও ফ্যাটের (স্নেহ পদার্থ) মাত্রা ঠিক রাখতে সুকৌশলে সোডা, লবণ, সয়াবিন তেল ও রাসায়নিক মেশানো হয়।

সম্পূর্ণ নকল দুধ: দুধের কোনো অস্তিত্বই থাকে না। ডিটারজেন্ট, সয়াবিন তেল, সোডা, চিনি ও কেমিক্যাল মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে দুধের সাদা ফেনা ও ঘনত্ব তৈরি করা হয়।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া এবং যশোরের কেশবপুরে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এমন একাধিক ভেজাল দুধের কারখানার সন্ধান মিলেছে।

স্বাস্থ্য খাতে দগদগে ঘা: এই ভেজাল দুধ তৎক্ষণাৎ কারও মৃত্যু ঘটাচ্ছে না ঠিকই, তবে মানুষের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই এই মারাত্মক ভেজালের শিকার।

উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ডা. মনোয়ার হোসেন বলেছেন, সোডা, অতিরিক্ত লবণ ও কেমিক্যালযুক্ত এই তরল নিয়মিত পানে মানুষের কিডনি, লিভার এবং পরিপাকতন্ত্র অকেজো হতে বাধ্য। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের শরীরে এর প্রভাব ভয়াবহ; এটি ক্যান্সারের মতো জীবনঘাতী রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ধসের মুখে গ্রামীণ অর্থনীতি: ‘সাদা বিষে’র এই তান্ডব কেবল জনস্বাস্থ্যকেই হুমকিতে ফেলেনি, বরং ধ্বংস করছে দেশের দুগ্ধ খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে। নকল দুধের উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম হওয়ায় তা বাজারে সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে সিরাজগঞ্জের মতো দেশের প্রধান ‘মিল্ক হাব’-এর প্রকৃত খামারিরা আসল দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। গোখাদ্যের উচ্চমূল্য এবং বাজারে কৃত্রিম দুধের সয়লাবের মাঝে টিকে থাকতে না পেরে অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আইনের বাস্তবায়ন নাকি পরোক্ষ অভয়ারণ্য: নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ। এই আইনে কঠিন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এবং বিএসটিআই (BSTI)-এর নিয়মিত বাজার তদারকি করার কথা।

অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রশাসনিক অভিযান পরিচালিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামান্য কিছু টাকা জরিমানা করেই দায় সারে ভ্রাম্যমাণ আদালত। উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হানুল ইসলাম জানান, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

তবে অভিজ্ঞ মহলের মতে, প্রশাসনের এই ধরাবাঁধা ‘আশ্বাস’ অপরাধীদের দমানোর বদলে একপ্রকার অভয়ারণ্য জুগিয়ে আসছে। তবে ‘নিরাপদ খাদ্য’ শব্দটি কেবল আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করতে হলে অবিলম্বে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে নামমাত্র জরিমানা না করে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী জামিনঅযোগ্য ধারায় সরাসরি জেল ও কারখানা স্থায়ীভাবে সিলগালা করতে হবে। যেসব নামীদামি মিষ্টির দোকান বা দুগ্ধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জেনেশুনে এসব কারখানা থেকে সস্তায় দুধ কিনছে, তাদেরও অপরাধের সমান অংশীদার করে বিচার আওতায় আনতে হবে। ঝটিকা অভিযান বা কোনো অনুসন্ধানের পর সাময়িক তৎপরতা না দেখিয়ে ‘মিল্ক হাব’ এলাকাগুলোতে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রশাসন/কেএ/ ২ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *