গঙ্গা চুক্তির তিন দশক: নবায়নের আহ্বানে ঢাকার অপেক্ষা, নীরব দিল্লি

তিস্তা থেকে গঙ্গা—ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিটি বাঁকেই নদীর পানি এক স্পর্শকাতর অধ্যায়। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতার দূরদর্শী সিদ্ধান্তে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে আগামী ডিসেম্বরে। চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসার ক্ষণ গণনার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কী হতে যাচ্ছে এর ভবিষ্যৎ?

দীর্ঘ তিন দশকের এই চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে একধাপ এগিয়ে এলেও, সীমান্ত পেরিয়ে নয়াদিল্লি থেকে এখনো মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সাড়া।

ঢাকার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি

গত জুন মাসেই চুক্তি নবায়নের আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়ে নয়াদিল্লিতে চিঠি পাঠায় ঢাকা। শুধু প্রস্তাব পাঠিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি বাংলাদেশ; আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে ভবিষ্যৎ দরকষাকষির কৌশল নির্ধারণে গঠন করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটিও।

ঢাকা চাইছে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যৌথ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির ভবিষ্যৎ রূপরেখা স্পষ্ট করতে, যাতে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে পানিবণ্টন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দোহাই ও নয়াদিল্লির অবস্থান

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য সরাসরি কূটনৈতিক নীরবতাকে আলোচনার অনিচ্ছা হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের দাবি, দুই দেশের মধ্যকার ‘যৌথ নদী কমিশন’ (জেআরসি)-এর মতো প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমেই এ আলোচনা এগোবে। ভারতের মতে, উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে জেআরসি বৈঠকের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে এবং সেখানেই পানির হিসাব-নিকাশ মেটানো হবে।

উল্লেখ্য, প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারেজে পানির প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে এই বণ্টন নির্ধারিত হয়, যা মূলত দুই দেশেরই কৃষি ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার জানালা

গত কয়েক বছরের নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও সম্পর্কের উত্থান-পতনের কারণে সীমান্ত নিরাপত্তা, কনস্যুলার সেবা কিংবা পানিবণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো থমকে ছিল। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বরফ গলতে শুরু করার সুযোগ সামনেই আসছে।

আগামী সেপ্টেম্বরে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নয়াদিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।

এই বহুপক্ষীয় মঞ্চের ফাঁকে যদি দুই শীর্ষ নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বাস্তবে রূপ নেয়, তবে ঝুলে থাকা গঙ্গা চুক্তির নবায়ন প্রক্রিয়া এক নতুন গতি পেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি শুধু পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কী বলছে সরকার

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানিয়েছেন যে, সরকার এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। তিনি বলেছেন, আমরা আশা করছি দুই দেশের বিশেষজ্ঞ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসবে। এরপর মন্ত্রীপর্যায়ে জেআরসির বৈঠকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করছি।

এদিকে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকেও আভাস পাওয়া গেছে যে, দুই দেশের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে। এরপর যৌথ নদী কমিশনে খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই দেশের তরফে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসতে পারে।

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলের শুরুতে সরকারি সফরে দিল্লিতে যাওয়ার আগে ঢাকায় কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে সফরের আলোচনায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টিও রয়েছে।

সফরকালে তিনি ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রথম পরীক্ষা।

তিনি বলেছিলেন, এখন যে চুক্তিটা আছে, তা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আমরা একটি সংশোধিত চুক্তি দেখতে চাই, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবে।

তবে তার সফরে এ বিষয়ে দুই পক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে কি-না কিংবা চুক্তির ক্ষেত্রে কী হতে যাচ্ছে- সে সম্পর্কে কোনো ঘোষণা সরকারের দিক থেকে আসেনি।

এর আগে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিত জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পরপরই বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে কথা বলেন।

তখন তিনি বলেছিলেন,  ‘আমরা এমনভাবে এগোবো, যাতে তা আমাদের জাতীয় স্বার্থ পূরণ করে।’

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ০৫ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *