শহরের ব্যস্ত রাস্তা, দূষণ আর কংক্রিটের ভিড়ে বন্যপ্রাণী? তাও আবার বন্যা মোকাবিলার দায়িত্ব নিয়ে! অবিশ্বাস্য মনে হলেও পশ্চিম লন্ডনের ইলিং এলাকায় ঠিক এমনটাই ঘটছে। ৪০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক বিশেষ প্রাণীকে ফিরিয়ে এনেই বদলে ফেলা হয়েছে স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি।
কেন বিভারকে ‘প্রকৃতির সেরা ইঞ্জিনিয়ার’ বলা হয়: বিভার কোনো সাধারণ প্রাণী নয়, বরং তারা বাস্তুতন্ত্রের এক নিখুঁত প্রকৌশলী। তাদের এই বিশেষ দক্ষতার পেছনে রয়েছে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য। আয়রনযুক্ত উজ্জ্বল কমলা রঙের দাঁত দিয়ে তারা অনায়াসেই বড় বড় গাছ কেটে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করতে পারে। তাদের তৈরি বাঁধ ও জলাধার বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে। ফলে শহর আর প্লাবিত হয় না, মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিভাররা ছোট ছোট খাল খনন করে, যা পানিকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয় এবং বন্যার তীব্রতা কমিয়ে দেয়। তাদের তৈরি জলাভূমি খরায় পানির আধার হিসেবে কাজ করে এবং মাটি আর্দ্র রাখে, যা দাবানল প্রতিরোধেও কার্যকর।
লন্ডনের ইলিং প্রজেক্ট, একটি সফল রূপান্তর: ২০২৩ সালে প্যারাডাইস ফিল্ডসের ২৪ একর জমিতে পাঁচটি বিভারের একটি পরিবার ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। প্রজেক্টটি শুরুর পর গত এক দশকে ওই অঞ্চলে প্রথমবারের মতো কোনো বন্যা হয়নি। এলাকাটি এখন পাখি, প্রজাপতি, বাদুড়সহ নানা জলজ প্রাণীর এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের কাছে বিভার এখন এক তারকা! তাদের দেখতে আয়োজিত হচ্ছে ‘বিভার সাফারি’ ও গাইডেড ট্যুর।
সতর্কতা ও বাস্তবতা: সবই যে জাদুর মতো ঠিক হয়ে যাবে, এমনটা ভাবাও সঠিক নয়। বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
ইউনিভার্সিটি অফ লিডসের অধ্যাপক জর্জ হোমস বলছেন, অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, বিভাররা জাদুর মতো সব সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, বিভাররা কোনো অতিমানবীয় জাদুকর নয়, বরং তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও মানুষের সহনশীলতা জরুরি।
চ্যালেঞ্জসমূহ: নদীর পাড়ে সুড়ঙ্গ তৈরির কারণে কৃষিজমি বা গবাদিপশুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনুমতি ছাড়া বিভার ছাড়া বা ‘বিভার বম্বিং’ পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সব জায়গায় বিভার মানিয়ে নিতে পারে না। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানির নিশ্চয়তা থাকা আবশ্যক।
ইলিং প্রজেক্ট আমাদের নতুন এক চিন্তার খোরাক দিয়েছে। কংক্রিটের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে প্রকৃতির সহজাত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শহরকে আরও বাসযোগ্য করে তোলা যে সম্ভব, বিভাররা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানই হতে পারে আধুনিক নগরায়নের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
জনপ্রশাসন/কেএ/৪ জুলাই২০২৬
