জুলাইয়ে সড়কে ঝরল ৪১৬ প্রাণ, বেশি মৃত্যু মোটরসাইকেলে

ছুটি, কর্মব্যস্ততা কিংবা প্রাত্যহিক যাতায়াত—সব মিলিয়ে দেশের সড়কগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গেল জুলাই মাসে সারাদেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪১৬ জন। এর মধ্যে ৫৪ জন নারী ও শিশু রয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ৬২৯ জন।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই মর্মান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

জুলাই মাসে সারাদেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪১৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৬২৯ জন। নিহতদের মধ্যে ৫৪ জন নারী ও শিশু রয়েছে। বিভাগের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি দুর্ঘটনা ও ১২৫ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে (২৯.০৩%)।

এছাড়া মহাসড়কে ৩৬.৮৯% এবং আঞ্চলিক সড়কে ৩৩.৮৪% দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যানবাহনের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল মোটরসাইকেল; ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট নিহতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। পাশাপাশি, রাস্তা পারাপার বা হাঁটার সময় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেলে। ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন মারা গেছেন, যা মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৩.১৭%)। বিশেষ করে তরুণদের বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এর অন্যতম বড় কারণ।

নিহতদের পেশাগত পরিচয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি। জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৩ জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

নিহতদের পেশাগত ও সামাজিক পরিচয়

জুলাই মাসের এই সড়ক দুর্ঘটনায় সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিক্ষার্থীদের ওপর; দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৩ জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২৩ জন নেতাকর্মী, ১৬ জন এনজিওকর্মী, ১৭ জন বিক্রয় প্রতিনিধি (রিপ্রেজেন্টেটিভ), ১৪ জন ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ২৭ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৭ জন শিক্ষক, ৩ জন সাংবাদিক, ২ জন চিকিৎসক, ২ জন প্রকৌশলী, ৩ জন আইনজীবী, ১ জন পুলিশ সদস্য এবং ১ জন বিজিবি সদস্য। এর বাইরেও কৃষি শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক, মসজিদের ইমাম-খাদেম এবং নানা বয়সের সাধারণ মানুষ এই মৃত্যুমিছিলে সামিল হয়েছেন। এছাড়া পুলিশ, বিজিবি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ও সংবাদকর্মীরাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

কোথায় ও কেন ঘটছে এসব দুর্ঘটনা?

বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কগুলোয় (৩৬.৮৯%), এর পরেই রয়েছে আঞ্চলিক সড়ক (৩৩.৮৪%)। দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা ও ক্লান্তি, মহাসড়কে স্বল্পগতির অবৈধ যানবাহন চলাচল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।

সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সংস্থাটি ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে কঠোর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। বিআরটিএ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন পুরোপুরি বন্ধ করা এবং চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বেতন ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা।

সড়কের এই রক্তক্ষয়ী চিত্র কেবল কিছু সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে শত শত ভেঙে পড়া পরিবার ও প্রিয়জন হারানোর আর্তনাদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নিয়ম বা সুপারিশ কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারের কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে এই মৃত্যুমিছিল রোধ করতে।

জনপ্রশাসন/ কেএ/ ০৬ আগস্ট ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *