নৌকায় নিয়ে দুই নৃত্যশিল্পীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ!

আমিরজাদা চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচের কথা বলে ডেকে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দুই নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী দুই নারীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সরাইল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী দুই নারী নৃত্যশিল্পী হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশনের জন্য ৯ হাজার টাকায় তাঁদের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাঁরা দলের সদস্যদের নিয়ে সরাইলে আসেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরাইলে পৌঁছানোর পর রাকিব নামে এক ব্যক্তি তাঁদের স্বাগত জানিয়ে শাহবাজপুর সেতুর নিচে নিয়ে যান। সেখানে রাকিবসহ আরও পাঁচজন তাঁদের একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তুলে তিতাস নদীর মাঝপথে নিয়ে যান।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়, নদীর মাঝপথে নৌকায় দুই নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। এ সময় তাঁদের দলের পুরুষ সদস্য সাইদ হোসেন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে অভিযুক্তরা তাঁকে ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে রাত ৯টার দিকে ভুক্তভোগী দুই নারীকে নাসিরনগর থানার গোকর্ণঘাট এলাকায় নামিয়ে দিয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা প্রথমে নাসিরনগর থানায় যোগাযোগ করেন। তবে ঘটনাস্থল সরাইল থানা এলাকার হওয়ায় তাঁদের সরাইল থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তাঁদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সরাইল থানায় মামলা করা হয়। মামলাটি ১১ সেপ্টেম্বর সরাইল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৩) ধারায় করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১০।

সরাইল থানার ওসি মো. মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। দ্রুত তাঁদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একের পর এক যৌন সহিংসতার অভিযোগ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনায় কোথাও ভুক্তভোগী শিশু, কোথাও কিশোরী, আবার কোথাও প্রাপ্তবয়স্ক নারী ছিলেন।

গত আগস্টে জেলার কসবায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয় এবং পরে জাহাঙ্গীর আলম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব পুলিশে হস্তান্তর করে।

জুনে নাসিরনগরে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে মামলা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, শিশুটিকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছিল।

সরাইলেও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সরাইলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক পলাতক বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আরও গুরুতর একটি ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় দুই মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর ১৩ ও ১৬ বছর বয়সী ওই দুই ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় একজন ছাত্রীর বাবা মামলা করেন।

তদন্ত ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রতিক এসব অভিযোগের ধরন ও বিস্তৃতি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, অপরাধের দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে কোনো অভিযোগের পর অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকর রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রতিটি ঘটনাতেই অভিযোগ ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। সর্বশেষ সরাইলের নৌকায় দুই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রেও পুলিশ তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারবে।

এদিকে, নৌকায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রয়েছে স্থানীয়দের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *