আনোয়ার হাকিম: বাঙালির স্বভাব হলো গা ভাসিয়ে চলা। পঞ্চান্ন বছরে আমরা যার যার সুবিধামত পালের অনুকূল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে চলেছি। সংস্কারে আমাদের ভীতি, মুখে বিপ্লবী ভাব থাকলেও বাস্তবে আমরা সামন্তবাদের ধারক- বাহক। বিগত সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার আর পুলিশ সংস্কার নিয়ে কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন নড়াচড়া হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে অনীহা প্রকট।
আমরা বরাবরই চেয়েছি মেধাহীন অযোগ্য ছা পোষা কেরানী টাইপের প্রশাসন। আর পুলিশকে ভেবেই নিয়েছি যখন যার তখন তার লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা যথেষ্ট স্মার্ট। সরকার ‘অ’ বলতেই তারা অজগরকে ঠিকই বুঝে ফেলে। সরকারও এরূপ প্রশাসনে স্বস্তি পেয়ে থাকে। ক্ষমতার পালা বদলে প্রশাসনের চরিত্র ও কর্মের ধরণ একই থাকে শুধু খেলোয়াড় বদলায় আর গোল পোস্ট শিফট হয়।
৩৬ জুলাইয়ের পর প্রশাসন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। আর পুলিশ তাদের কৃতকর্মের সম্ভাব্য দণ্ড অনুমান করে আগেভাগেই থানা ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রশাসন ও পুলিশ ভেবেই নিয়েছিলো যে, বৃটিশ রাজের উত্তরাধিকার হিসেবে তাদের কর্মজীবন আর অবসর গ্রহণের যাত্রাপথ পূর্বসূরিদের মতই মসৃণ হবে।
৩৬ জুলাই তাদেরকে পৃথক আয়নার মুখোমুখি করিয়ে জানান দিয়ে গেছে যে, এরূপ যাত্রাপথ মোটেই মসৃণ নয় বরং দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। এরকমই দেখা গেছে কেন্দ্র থেকে বিভাগ, জেলা, উপজেলায় -যা স্বাধীনতার পর এভাবে এতটা আর দেখা যায় নি। ছাত্র- জনতা মাঠে নেমে এসেছে যাবতীয় বৈষম্য, জোর – জুলুম- নির্যাতন আর গুম- খুনের বিরুদ্ধে। প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধে। ফ্যাসিস্টের উৎখাতে।
প্রশাসন আর পুলিশ ফ্যাসিস্ট শক্তির দোসর হয়ে জন আকাঙ্খার বিপরীতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। বিপ্লবোত্তর প্রশাসনে তাই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। এখনো তাতে অনেক সমস্যা সক্রিয় ও সুপ্ত। কিন্তু পুলিশের বিধ্বংসী ভূমিকা, ঝাঁকে ঝাঁকে পলায়ন আর এখনো আত্মগোপনে থাকার চিত্র পুলিশকে প্রজাতন্ত্রের বাহিনী থেকে বিশেষ দল ও শীর্ষ ব্যাক্তি বিশেষের আজ্ঞাবহ বাহিনীর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। যা এখনো যাবতীয় দাওয়াই প্রয়োগ করেও সারানো সম্ভব হচ্ছে না।
৩৬ জুলাইয়ের পর থানাগুলো ছিলো পরিত্যক্ত। বিক্ষুব্ধ জনতা তার অনেক গুলোকেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। অনেক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। নিহতের পরিসংখ্যান জানা যায় নি। অনেকে স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদী পলাতক ছিলেন। এখনো অনেকে দীর্ঘমেয়াদি পলাতক রয়েছেন। অনেকে বিদেশের মাটিতে বসে আয়েসি জীবন যাপন করছেন আবার অনেকেই লাইভ ভিডিও-র মাধ্যমে নিবার্পিত আগুন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

৩৬ জুলাইয়ের পর, অন্তত দু’জন আইজি সহ শীর্ষ অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এখনো কারাগারে, অনেকেই বিচারাধীন ও তদন্তাধীন। ইতিহাস সৃষ্টি করে একজন আইজিপি রাজসাক্ষীও হয়েছেন এবং তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ফ্যাসিস্টের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃত্বের অনেকেই মৃত্যুদণ্ড সহ বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হয়েছেন। অনুরূপভাবে প্রশাসনের সিনিয়র সচিবসহ অনেক সচিব এখনো কারাগারে। অনেকে পলাতক, অনেকে দেশান্তরি। অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। আরো অনেকে পাইপ লাইনে আছে বলে শোনা যাচ্ছে।
দেশের এককালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী প্রধান বিচারপতিও বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে তদন্তাধীন অবস্থায় কারাগারে। অন্তত দু’জন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নাজেহাল হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে। অষ্টমাশ্চর্যের বিষয় এই যে, বায়তুল মোকাররমের খতিবও পলাতক হয়েছেন। কিসের জন্য তিনি পালালেন কেউ বলতে পারে না। আগামী একশ বছর তার এই পলায়নের দৃষ্টান্ত রেকর্ড বুকে কালো অধ্যায় হিসেবে জায়গা দখল করে থাকবে।
স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরে সরকারি কর্মকর্তাদেরকে এরকম দুর্ভোগ আর পোহাতে হয়নি কখনো। জাতির জন্য তা যেমন কলংকজনক তেমনি আশংকাজনকও। এত এত সরকারি কর্মকর্তা ভোগান্তিতে থাকলেও ক্যাডার বা পেশা কিন্তু এখনো সচল রয়েছে, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হলেও দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। কেবল পুলিশই তা পারছে না। পোশাক পাল্টিয়ে, ঘন ঘন বদলী করে, অনেককে সাময়িক বরখাস্ত করে, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করেও পুলিশ এখনো দাঁড়াতে পারছে না এটাই বাস্তবতা।
জনগণের কাছে পুলিশের কোন ইমেজ আছে বলে মনে হচ্ছে না। আছে প্রচণ্ড আক্রোশ ও প্রবল ঘৃণা। রাস্তায়, থানায় তারা দৃশ্যমান হলেও তাদের বডি ল্যাংগুয়েজে আগের সেই তরতাজা ভাব নেই। তারা এখনো পাবলিকের ঝারি খাচ্ছে, বদলী আতংকে কোথাও মনেপ্রাণে থিতু হতে পারছে না, অনেক জায়গায় হেনস্তার শিকারও হচ্ছে। কিন্তু সমাজের কোনো পক্ষ থেকে কোনরূপ সহানুভূতি পাচ্ছে না। এটাই হতাশার আর উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি গুজবে উত্তেজিত হয়ে বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলার এলাকাবাসী কর্তৃক সংশ্লিষ্ট থানা আক্রান্ত হয়েছে।
বিক্ষুব্ধ জনতা শুধু থানাই আক্রমণ করে ক্ষান্ত হয় নি। থানার ভেতর ঢুকে একাধিক পুলিশকে বেধড়ক পিটিয়েছে। থানার দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ওসিকেও কান্না জড়িত কণ্ঠে লাইভে বিলাপ করতে দেখা গেছে। এ দৃশ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক, কিন্তু নেট দুনিয়ার সিংহভাগ ফলোয়ারের কমেন্ট পড়ে মনে হলো তাদের এই করুণ অবস্থাতেও কারো ন্যুনতম কোনো সহানুভূতি নেই। তাই, সরকারকে নতুন করে পুলিশ নিয়ে ভাবতে হবে। পুলিশকেও জনগণের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে তাদের কর্মতৎপরতা দেখাতে হবে।
পুলিশ ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না, চলবেও না এটাই বাস্তবতা। তাদের চাকরি শুধু চব্বিশ ঘন্টায় সীমাবদ্ধ না। সপ্তাহের, মাসের, বছরের – প্রতিদিনের। ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়, আসামী গ্রেফতারে, মৃত ব্যাক্তির সৎকারে, ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণে, সন্তান হারিয়ে গেলে, স্বজন নিখোঁজ হয়ে গেলে, মাদকাসক্ত হয়ে পিতামাতার উপর সন্তান চড়াও হলে, কোন জিনিস হারিয়ে গেলে, সিলিং ফ্যানে বা অন্য কোনো উপায়ে আত্মহত্যাকারীর লাশ ব্যবস্থাপনাতে, দরোজা ভেঙ্গে পাঁচ-সাতদিনের পচা গলা লাশ উদ্ধারে, তদন্ত কাজে সাক্ষ্য ও আলামত সংগ্রহে এবং আদালতে তা উপস্থাপনে, পাবলিক প্লেসে টহলদানে, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে তাদের কোনো বিকল্প নেই। এসব কাজের ফিরিস্তি দিতে গেলে কাগজ শেষ হয়ে যাবে তবু কাজের তালিকা শেষ হবে না।

পুলিশে বড় আকারে নিয়োগ এখন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সরকার এস আই পদে চৌদ্দ হাজার, কন্সটেবল পদে দশ হাজার ও সার্জেন্ট পদে চারশ’ জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। তবে নিয়োগ হতে হবে কেবলমাত্র স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে। এই চূড়ান্ত ও শক্ত কথাটা আসতে হবে শীর্ষ নির্বাহী পর্যায় থেকে দৃশ্যমান হিসেবে আর মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এ থেকে বিযুক্ত রাখতে হবে অত্যন্ত কঠোরভাবে। কাজটি আমাদের প্রশাসনিক কালচারে কঠিন সন্দেহ নাই কিন্তু অসম্ভবও না।
প্রশিক্ষণ হতে হবে ঘন ঘন ও কঠিন। দরকার হলে সিলেবাস রিভিউ করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণে পুলিশের যতটা অনীহা তা অন্য কোন সার্ভিসে ততটা দেখা যায় না। এই প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বদলী ও পদায়নে ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। নন-ক্যাডার ও নিম্নপদে যথাসময়ে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রদান করতে হবে। ভালো কাজে যেমন পুরষ্কার প্রয়োজন তেমনি খারাপ কাজে শুধু তিরষ্কার না, যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে।
সার্ভিসগত প্রাপ্য সকল সুযোগ-সুবিধা সহজসাধ্য করতে হবে। বিদেশি মিশনে জনবল প্রেরণে নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে তবে তা কোন ক্রমেই ব্যাক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য না। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশকে রাষ্ট্রের সকল অঙ্গের সাথে একযোগে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে অতীতে তাদের একলা চলোর ভ্রান্ত নীতি তাদেরকে আজকের এই নির্বান্ধব পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো চলে কমাণ্ডের উপর। তাই যারা পুলিশকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদেরকে সেভাবেই নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে হবে। নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা, সাহসিকতা ও ইনসাফ বিতরণই হতে পারে এর সুরক্ষা কবচ। আর এর জন্য চাই নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের গঠনমূলক ও বিবেচনাপ্রসূত পৃষ্ঠপোষকতা। অতীতে এই জায়গায় যথেষ্ট ঘাটতি পরলক্ষিত হওয়ায় পুলিশও নিজেদেরকে সুসংঘটিত করার চেয়ে নিজেদের ব্যাক্তি স্বার্থকে বড় করে দেখেছে।
ফলতঃ পুলিশ নিজে যেমন আজ আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছে তেমনি সরকার ও জনগণ তাদের কাছ থেকে কাংখিত সেবা পাচ্ছে না। বিগত বছরগুলোতে রিফর্মের নামে কি হয়েছে, এতে কার দায় কতটুকু সে আলোচনায় না গিয়ে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশকে নতুন ভাবে সাজানোর কাজ শীঘ্রই শুরু করা দরকার। সবার সুবিবেচনা ও আন্তরিক সমর্থনে পুলিশ নবোদ্যমে যাত্রা শুরু করবে – এটাই এই সময়ের প্রত্যাশা। সবার সুবোধ জাগ্রত হোক।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক সচিব
