ভূমি অফিসে সবাই ভূপাতিত!

আনোয়ার হাকিম: ভূমি সবার কাছে অতি মূল্যবান সম্পদ। হাল আমলে ফ্ল্যাট বা বিল্ডিংও। এর তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ যেমন প্রয়োজন তেমনি এর মালিকানা অটুট রাখাও অপরিহার্য। নিজের ঘাড়ে না পড়লে কেউই যে ভূমি অফিসের চৌকাঠ মাড়ায় না এটাও বাস্তব সত্য। সবাই অন্যকে দিয়ে কাজটি সেরে ফেলতে চায়। আর এখানেই ভূমি অফিসের তেলেসমাতি।

বেশিদূরে গিয়ে লাভ নেই। আপাতত ব্রিটিশ আমল থেকেই শুরু করা যাক। তখন নায়েব শ্রেণি ব্রিটিশ রাজের বড়ই অনুগত, বিশ্বস্ত ও কঠিন প্রকৃতির ছিলেন। এজন্য সাহেবগণ তাদেরকে পছন্দও করতেন। খুব বেশি গড়মিল না হলে তাদেরকে ঘাটাতেন না। এ সুযোগে অনেক নায়েব জমিদার হয়ে যায়। বিষয় আশয়ে কুলীন শ্রেণীতেও উত্তীর্ণ হয়ে যায় অনেকে। বলাবাহুল্য এই ‘নায়েব’ পদবাচ্যের পরবর্তী নামকরণ করা হয় ‘তহশীলদার’।

নামে কী যায় আসে? পাকিস্তানি আমলে ও স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশেও নায়েবের মত তহশীলদাররাও ধারে ভারে সেম টু সেম। যে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তহশীলদারের কাছে সমর্পণ ভিন্ন অন্য কোন পথ থাকে না। ফলতঃ রাজা যায় রাজা আসে তহশিলদাররা বহাল তবিয়তেই টিকে আছে। কিছুদিন আগে নামের গ্ল্যামার বাড়াতে ‘অফিসার’ পদবী যুক্ত করে তারা এখন ‘ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা’।

আগে তহশীলগুলোর অবস্থা ছিলো জরাজীর্ণ। কোনোটায় বেড়া ছিলো তবে ছিদ্রও ছিলো অনেক। কোনোটার দরোজার কড়া ছিলো, তালাও ছিলো। আবার কোনোটাতে তালার বিকল্প হিসেবে রশি ব্যবহৃত হত। কোনোটার টিনের চাল চুইয়ে অঝোর ধারায় বর্ষণের পানি ভেতরে জমা হত। এতে ভূমি স্বত্বের ভলিউম ও খাজনা- খারিজের দস্তাবেজ ভিজে মলিন হয়ে যেত, ছিঁড়েও যেত।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো বেশিরভাগ ভূমি অফিসের অবস্থান ছিলো লোকালয় থেকে দূরে, নির্জন স্থানে, চরাঞ্চলে, হাওরের সামান্য উঁচু টিলাতে আর গ্রামীন হাটবাজারের পেছনে ভঙ্গুর অবস্থায়। অবশ্য, ইদানীং বেশিরভাগ তহশীলের এরূপ ভগ্নদশা নেই। দালান উঠেছে, দরোজা জানালার কাঠামো স্টীল ফ্রেমের হয়েছে। হেজবল্ট সহ ঢাউস টাইপের তালাও রক্ষাকবচ হিসেবে অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছে। এত কিছুর মেকআপ কর্ম করার পরেও ভূমি অফিস নিয়ে সাধারণ্যে, পত্রিকান্তরে, ফেসবুকে, আলাপ আলোচনায়, টক শোতে সমালোচনার কমতি নেই।

সমালোচনা করা, বিশেষত অন্যের ও দুর্বলের সমালোচনা করা যেন উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের জন্মগত অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমি অফিসে সেবার বিনিময়ে হয়রানি আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত সত্যের মত হয়ে গেছে। বিপরীতে ভূমিসেবা খাতে যে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে তার প্রচারণা নেই। যারা সেবা পেয়ে থাকেন তারা সেবা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকেন কিন্তু বিষয়গুলো অপরাপরের সাথে শেয়ার করেন না। যার ফলে ভূমি অফিস সম্মন্ধে আগেকার ভীতিকর অভিজ্ঞতা ও যাতনার কথা এখনো সমাজে মীমাংসিত বিষয়ের মত প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।

মোটাদাগে, ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে সেবাপ্রত্যাশিদের অভিযোগ হলো নামজারি- জমাখারিজ এবং খাজনা আদায়ে সীমাহীন অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। অথচ এখন ভূমি অফিসের ডিজিটালাইজেশনের কাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে নামজারি করা যাচ্ছে। নিজেই নিজের ডকুমেন্টস সহ আবেদনপত্র সার্ভারে আপলোড করা যাচ্ছে। এরপর ট্র‍্যাকিং নম্বর ধরে নিজের আবেদনপত্রের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। সে নথী কার কাছে কী জন্য পড়ে আছে তাও জানা যাচ্ছে। পরবর্তী ধাপ কি তাও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শেষমেশ আবেদন মঞ্জুর হলে তা ডাউনলোড করে বাকি কাজ সারা যাচ্ছে। নামঞ্জুর হলে তার কারণও অনলাইনে জানা যাচ্ছে।

খাজনা প্রদানের সময়েও একই রূপ ব্যবস্থা। অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশ, নগদ ইত্যাদির মাধ্যমে সরাসরি খাজনা পরিশোধ করা যাচ্ছে, বকেয়া সহ। তারপরেও কেন এত অভিযোগ? এর জন্য তদারকি ব্যবস্থস্পনার কোথাও যে ঘাটতি আছে তা বলাই বাহুল্য। অতি সম্প্রতি ঢাকার জেলা প্রশাসক বোরকা পড়ে রাজধানীর উত্তরখান ভূমি অফিস সরেজমিনে পরিদর্শন করে গেছেন। সেখানে অপেক্ষারত সেবাপ্রত্যাশিদের সাথে তাদের অভাব- অভিযোগ সম্মন্ধে আলোচনাও করেছেন। এরূপ কর্ম তার অধস্তন অফিসারদের রুটিন দায়িত্ব। সেখানেই করণীয় আছে বলে মনে করি।

এসি ল্যাণ্ডরা প্রশাসন ক্যাডারের নবীনতম ব্যাচ থেকে পদায়িত হয়ে থাকেন। অনভিজ্ঞতা তাদের উইকনেস। কিন্তু সৃজনশীলতা ও সততা তাদের স্ট্রেংথ হওয়ার কথা। এখানে কি কোনো ঘাটতি আছে? নাকি অনভিজ্ঞতার কারণে উপরস্তের কাছে নিজের দুর্বলতা যেন প্রকাশ না পায় সেজন্য অভিজ্ঞ ও ঝানু নিম্নপদস্থ সহকারীদের কাছে আত্মসমর্পণই এর জন্য দায়ী? নাকি সামাজিক বাস্তবতায় “জো আপসে আতা হ্যায় ও হালাল হ্যায়”? এখন খুব সহজেই মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান ইত্যাদি সরকারি নির্ধারিত ফিস জমা দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে বলে সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে।

পাওয়া কি যাচ্ছে সেরূপে? সেখানেও কি কর্তৃপক্ষের তদারকিতে গাফিলতি রয়েছে? সিস্টেম আছে কিন্তু যারা সিস্টেম চালু রাখবেন বা তদারকির দায়িত্ব পালন করবেন তাদের সততা ও একনিষ্ঠতার উপর নির্ভর করবে সিস্টেমের পারফর্মেন্স। যন্ত্রের কী দোষ? যন্ত্রের পেছনে কর্মরত মানবের নির্দেশনা ও সদিচ্ছাই যন্ত্রের উৎকর্ষতাকে ছড়িয়ে দেবে সেবাপ্রত্যাশিদের কাছে তাদের চাহিদা অনুযায়ী।

ভূমি ব্যবস্থাপনা অনেক ব্যাপক বিষয়। রেজিস্ট্রেশন বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন। সেটাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ছাতার নিচে এনে ভূমি সেবা সহজীকরণ করার একাধিক সিদ্ধান্ত ‘পাওয়ার গেমে’র কারণে আলোর মুখ দেখছে না। ফলতঃ ভূমি রেজিষ্ট্রেশন অফিসের অরাজকতা ও অব্যস্থাপনা পাবলিক নিরুপায় হয়ে নিজেদের জরুরত বিবেচনায় যেন একরকম মেনেই নিয়েছে। সেটেলমেন্ট ডিপার্টমেন্ট নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। কার জমি কার নামে কী পরিমাণে রেকর্ড হচ্ছে তার হিসেবনিকেশ নেই। এখানেও তদারকির যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে সেবাগ্রহীতাদের উদাসীনতা, অন্যকে দিয়ে, মিডিয়া ধরে কাজ সেরে ফেলার প্রবণতা ও সেবাদাতাদের দৌরাত্ম্যে অসহায় ভূমি মালিকের খরচাপাতিসহ নি:শর্ত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা থাকেনা। প্রভাব খাটিয়ে বিনা পয়সায় কাজ সেরে ফেলার চেষ্টা করলে কপালে ভোগান্তির শেষ থাকে না। একথা নাবালকও জানে।

মোটকথা সেবা সহজীকরণের অনেক কিছুই করা হয়েছে, সিস্টেমও আছে কিন্তু কাজ করছে না। যার ফলে জনগণ ক্ষুব্ধ ও সমালোচনা মুখর। এসি ল্যাণ্ডদের প্রয়োজনীয় মোটিভেশান যেমন প্রয়োজন তেমনি মাঠ পর্যায়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের প্রকৃত তদারকি (কাগুজে নয়) অত্যাবশ্যক। ভূমি অফিসের অনলাইন সেবা আরো কতটুকু জনগণের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ ব্যাতিরেকে সিস্টেমের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করা যায় সেটাও মাথায় রাখতে হবে। নিয়মিত বিরতিতে এসি ল্যাণ্ডদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ ও রিফ্রেসার্স কোর্সের ব্যবস্থা করা গেলে ভূমি ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত হবে এ প্রত্যাশা করাই যায়।

দুর্নীতি সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী হয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে অক্টোপাসের মত আষ্টেপৃষ্টে বেধে ফেলেছে। এ থেকে মুক্তির পথ হলো জনগণের সোচ্চার অবস্থান ও সরকারি কর্তৃপক্ষের ‘ধ্যানজ্ঞান’ যথাস্থানে নিবিষ্ট রাখা। অমুক ডিপার্টমেন্ট দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সে তুলনায় আমরা অনেকটাই ভালো বলে আত্মতুষ্টি পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

নিজেকে উৎকর্ষতার উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে অপরের ‘গান্ধা কর্ম’ কখনোই ‘জায়েজ’ ফর্মুলা হতে পারে না। ভূমি অফিসের হার্ডওয়ারের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। কেবল সেবা মনষ্কতার সফটওয়্যার আরো ডেভেলপ হওয়া সময়ের দাবি। তা নাহলে ভূমি অফিসে সবাই ভূপাতিত হবে – এটাই যেন নিয়তি। সবার সুবোধ জাগ্রত হোক। #

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক সচিব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *