মমতার নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট, নতুন সমীকরণে দিল্লি-ঢাকা

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবার এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড় নিয়েছে। মাত্র ৮০টি আসনে থিতু হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে এখন স্পষ্ট ভাঙনের সুর। দলটির প্রায় ৫০ জন বিধায়ক একযোগে দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে।

আগামী ১৮ জুন শুরু হতে যাওয়া বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের আগেই দলটির একটি বড় অংশ বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় কাঁপছে রাজ্য রাজনীতি।

তৃণমূলের এই নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ সংকট কেবল বাংলার ক্ষমতা বদলই নয়, বরং ভারতের জাতীয় রাজনীতি এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতেও বড় ধরনের সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কেন এই নজিরবিহীন বিপর্যয়?
১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত বড় অস্তিত্ব সংকটে কখনো পড়েননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মূলত চারটি বড় কারণ কাজ করছে।

ক্ষমতা হারানোর ধাক্কা ও ক্ষোভ: দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে অভূতপূর্ব জয় পেয়ে সরকার গঠন করায় ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে গেছে। বিরোধী আসনে বসার পরপরই হারের দায় নিয়ে দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের চাপা অসন্তোষগুলো হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছে।

কর্পোরেট এজেন্সির অতিরিক্ত আধিপত্য: দল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত মুখপাত্র রিজু দত্তের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট যে, তৃণমূলের প্রবীণ ও মাঠপর্যায়ের নেতারা মনে করছেন ‘আই-প্যাক’ (I-PAC)-এর মতো বহিরাগত কর্পোরেট এজেন্সির সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের একক নিয়ন্ত্রণই দলের তৃণমূল স্তরের নেতাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে।

অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব: বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, দলে এখন আর মুক্তভাবে কথা বলার কোনো জায়গা নেই। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক সিদ্ধান্ত এবং প্রবীণ নেতাদের কোণঠাসা করে রাখার নীতি অনেক বিধায়ককে বিদ্রোহী করে তুলেছে।

আইনি ও কেন্দ্রীয় সংস্থার চাপ: ইডি (ED) বা সিবিআই (CBI)-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর লাগাতার অভিযানের কারণে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এমনিতেই মানসিকভাবে চাপে ছিলেন। এই দুর্বলতার সুযোগে দলের ক্ষুব্ধ অংশটি এখন দল ভাঙার সাহস পাচ্ছে।

দিল্লির রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া
পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক ওলটপালট দিল্লির রাজনীতিতেও এক বিরাট সমীকরণ বদলের বার্তা দিচ্ছে। জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী মুখ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলায় তৃণমূলের এই পতন ও সম্ভাব্য ভাঙন পুরো জাতীয় স্তরের বিরোধী জোটকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিল।

একই সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপির জন্য একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ মনে করা হতো। এখানে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করায় নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের জাতীয় ন্যারেটিভ বা বয়ান আরও শক্তিশালী হলো।

এ ছাড়া, এতদিন কেন্দ্রের বিভিন্ন নীতি (যেমন- সিএএ/এনআরসি বা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কল্যাণমুখী প্রকল্প) বাস্তবায়নে পশ্চিমবঙ্গ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। রাজ্যে এখন বিজেপি ক্ষমতায় আসায় কেন্দ্রের নীতিগুলো কোনো বাধা ছাড়াই বাস্তবায়িত হবে, যা ভারতের সামগ্রিক ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনবে।

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন সমীকরণ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব সবসময় বাংলাদেশের ওপর পড়ে। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষিতে তিনটি ক্ষেত্রে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

তিস্তা ও অন্যান্য পানি বণ্টন চুক্তি: এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র বিরোধিতার কারণেই ঢাকার সাথে দিল্লির ‘তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি’ আটকে ছিল। যেহেতু এখন বাংলায় বিজেপি সরকার এবং কেন্দ্রেও এনডিএ জোট, তাই তিস্তা চুক্তি বা অন্যান্য ঝুলে থাকা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এগিয়ে নেওয়া দিল্লির জন্য অনেক সহজ হবে।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ইস্যু: বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডায় সবসময়ই ‌‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ এবং সীমান্ত চোরাচালান বন্ধের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের নজরদারি এবং কড়াকড়ি অনেক বেড়ে যেতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।

অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ: কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের (বিজেপি) সরকার থাকায় বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের মধ্যে রেল, বন্দর এবং ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতি পাবে। জলপাইগুড়ি বা কলকাতার সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও যাতায়াত আরও সহজতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃণমূলের এই ভাঙনের সুর কেবল মমতার একক ক্ষমতা হারানোর গল্প নয়; এটি ভারতের পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সমীকরণগুলোকে নতুন করে লেখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৮ জুনের আসন্ন বাজেট অধিবেশনই হয়তো ঠিক করে দেবে বাংলার রাজনীতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে।

জনপ্রশাসন/এফওয়াই/ জেডআরসি/ ‌১০ জুন ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *