জাতীয় সুরক্ষায় ‘স্মার্ট সীমান্তে’ রূপান্তর হচ্ছে বাংলাদেশ

যুগ যুগ ধরে অরক্ষিত সীমান্ত পথ ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে মিয়ানমারের মাদক আর ভারতের অবৈধ পণ্য। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে গেছে। শুধু চোরাচালানই নয়, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং ভারত সীমান্ত থেকে ‘পুশইন’-এর মতো ঘটনা এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

এমন প্রেক্ষাপটে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত অপরাধ ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এবার প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও নিজের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে যাচ্ছে।

মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তে বেড়া: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সড়ক নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সড়ক শেষ হওয়া মাত্রই শুরু হবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার মূল কাজ।

৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল সীমান্তেও বেড়া দেওয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া ও পরিকল্পনা শুরু করেছে ভারত সরকার।  আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সীমান্ত শূন্যরেখা (জিরো লাইন) থেকে ১৫০ গজ দূরত্ব বজায় রেখেই এই বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ‘স্মার্ট বর্ডার সার্ভেইল্যান্স’: দুর্গম পাহাড়ি ও নদীপথের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা জয় করতে বিজিবি যুক্ত করেছে আধুনিক প্রযুক্তি। ঘন কুয়াশা বা রাতের অন্ধকারে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন, নাইট ভিশন ক্যামেরা ও থার্মাল ইমেজার দিয়ে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্তে সমতল এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ ওয়াচ গ্রুপ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলওয়ার হোসেন জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে মিয়ানমার সীমান্ত নিয়ে কিছুটা আন্তর্জাতিক বা কূটনৈতিক চাপ আসতে পারে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও নৈতিক।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়েছেন, এই বেড়া নির্মাণ হলে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ ও অবৈধ যাতায়াত প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে আসবে। তবে বেড়ার পাশাপাশি নজরদারির সক্ষমতা ধরে রাখা জরুরি।

স্বস্তিতে সীমান্তবাসী: দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের পর সরকারের এই উদ্যোগে স্বস্তি ফিরেছে নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও তুমব্রুসহ সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মনে। ইতোমধ্যে জমির মালিকানা যাচাই ও অধিগ্রহণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। সীমান্তবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সীমান্তের দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাস চিরতরে বন্ধ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *