দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশটি ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা-এই দুইয়ের মাঝে নিজেকে অনন্য করে তুলেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির উপলক্ষ নয়; বরং এটি হলো ওয়াশিংটন, দিল্লি এবং বেইজিংয়ের তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বজায় রাখার একটি অত্যন্ত পরিপক্ক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং সম্পর্কের উন্নয়ন: বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক সাধারণ বাণিজ্যিক স্তর থেকে উন্নীত হয়ে “ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে” রূপ নিয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশই দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ভারত ও চীনের মাঝে ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’: বাংলাদেশের কূটনীতির মূল ভিত্তি হলো—”সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”।
ভারতের দৃষ্টিকোণ: বাংলাদেশ যেকোনো বড় প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার খাতিরে ভারত সেদিকে কড়া নজর রাখে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি বা বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে দিল্লির একধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে।
ভারসাম্য রক্ষা: প্রধানমন্ত্রী এই সফরে এমন একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেখানে চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদারত্ব বৃদ্ধি পেলেও তা ভারতের সাথে থাকা কৌশলগত সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। অর্থাৎ, এটি একটি খাঁটি “অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কূটনীতি”।
গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI) ও বেল্ট অ্যান্ড রোড (BRI): চীন তার নিজস্ব বৈশ্বিক কৌশল গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI) এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এর আওতায় বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে চায়। এই সফরের মাধ্যমে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, প্রযুক্তি এবং শিল্পায়নে চীনা বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে, যা বেইজিংয়ের আঞ্চলিক প্রভাবকে আরও সুসংহত করবে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকা: ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাচাড়ার বিষয় হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমারে চীনের বিশাল প্রভাব রয়েছে। এই সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে এবং মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বেইজিংয়ের সক্রিয় মধ্যস্থতার বিষয়টি বাংলাদেশ জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বনাম ‘ঋণ ফাদ’ বিতর্ক: পশ্চিমা বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চীনা বিনিয়োগকে “ডেবট-ট্র্যাপ” বা ঋণের ফাদ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে। এই সফরের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ মূলত বাজেট-সহায়তা, অনুদান, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং স্থানীয় মুদ্রায় (ইউয়ান ও টাকা) লেনদেনের সুযোগ খোঁজার ওপর বেশি জোর দিয়েছে, যাতে দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ কম পড়ে এবং ঋণঝুঁকি এড়ানো যায়।
জনপ্রশাসন/কেএ/২৬/০৬
