‘ঢাকার প্রাণ’ রক্ষা: অন্তহীন পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

ঢাকাকে একটি জীবন্ত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা-এই চার নদীকে বাঁচানো অপরিহার্য।

তবে উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক নির্দেশনার দেড় যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, ঢাকার এই লাইফলাইনগুলো এখনো টেকসই সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং প্রভাবশালীদের দখলের কারণে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে নদীগুলো এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।

আদালতের নির্দেশনা বনাম বর্তমান বাস্তবতার ব্যবধান: ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত নদী রক্ষায় যে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

পিলার ও সীমানা জটিলতা: ১০ হাজার সীমানা পিলারের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখনও ১ হাজারের বেশি পিলার বসানো বাকি। প্রায় ৩২ কিলোমিটার এলাকায় কোনো পিলারই নেই।

সুরক্ষা অবকাঠামোর অভাব: নদীকে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখতে প্রায় ২২০ কিলোমিটার নদীপাড় সুরক্ষিত করার কথা ছিল। কিন্তু এখনো ১৪৮ কিলোমিটার নদীপাড়ে ‘কি-ওয়াল’ (স্থায়ী তীররক্ষা দেয়াল) নির্মিত হয়নি। ফলে এসব এলাকা প্রতিনিয়ত নতুন করে দখলের হুমকিতে পড়ছে।

‘ঢাকার প্রাণ’ রক্ষা: অন্তহীন পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জস্থবিরতা ও ব্যয় বৃদ্ধিবিআইডব্লিউটিএ (BIWTA) ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক জায়গায় পুনরায় দখলদারিত্ব ফিরে এসেছে। তিন ধাপের মহাপরিকল্পনার চিত্রটি নিচে দেওয়া হলো-

প্রকল্পের ধাপ: লক্ষ্য ও বর্তমান অবস্থাপ্রধান প্রতিবন্ধকতাপ্রথম ধাপমাত্র ২০ কিমি হাঁটার পথ ও সীমিত অবকাঠামো নির্মাণ। প্রাথমিক সমন্বয়হীনতা ও দূরদর্শিতার অভাব।

দ্বিতীয় ধাপ: ৭,১০০ পিলারের মধ্যে ৬,৩০০টি স্থাপন; ৫২ কিমি ওয়াকওয়ের মধ্যে ৪২ কিমি সম্পন্ন।জমি-সংক্রান্ত মামলা, আন্তঃসংস্থা বিরোধ এবং বাজেট ৮৪৮ কোটি থেকে বেড়ে ১,২৭৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

তৃতীয় ধাপ: কেরানীগঞ্জ, ডেমরা, পাগলা, বন্দর ও পূর্বাচল অঞ্চলের ১৪৮ কিমি নদীপাড় সুরক্ষা।বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের কথা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘকাল ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও নতুন সরকারের উদ্যোগ (সর্বশেষ তথ্য)সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নদী রক্ষায় কিছুটা গতি ও নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কঠোর টাস্কফোর্স গঠন: জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে নতুন করে অবৈধ দখলদারদের তালিকা হালনাগাদ করছে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব: শুধু ওয়াকওয়ে বা পিলার বসানো নয়, বরং বুড়িগঙ্গাসহ অন্য নদীগুলোর পানি দূষণমুক্ত করতে হাজারীবাগ ও সাভারের চামড়া শিল্পনগরী (CETP) এবং ডাইং কারখানাগুলোর বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

আন্তঃসংস্থা সমন্বয়: ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর মধ্যকার দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি একক মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উচ্ছেদ নাটক বা কাগুজে পরিকল্পনা দিয়ে নদী বাঁচানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও বাস্তবসম্মত কৌশল।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ: ঢাকা ও চারপাশের সমস্ত কলকারখানায় ইটিপি (ETP) বাধ্যতামূলক এবং সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে। বুড়িগঙ্গায় এসে পড়া সব নালা ও ড্রেনে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসাতে হবে।

নদী রক্ষা কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া: জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শুধু ‘পরামর্শক’ হিসেবে না রেখে, নদী অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি ও জরিমানা করার জন্য স্বাধীন বিচারিক বা আইনি ক্ষমতা দিতে হবে।

জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতা: স্থানীয় জনগণকে নদী সুরক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞের মতে, ঢাকার চার নদী আজ আইসিইউতে। এখনই যদি সব সংস্থা একযোগে কঠোর ও সমন্বিত অ্যাকশনে না যায়, তবে এই নদীগুলো চিরতরে অচল ও মৃত জলাভূমিতে পরিণত হবে। যার মাশুল দিতে হবে পুরো ঢাকাবাসীকে—পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির চরম বিপর্যয়ের মাধ্যমে।

 

জনপ্রশাসন/কেএ/২৬/০৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *