শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়ছে ব্রিটেন!

ব্রেক্সিট কার্যকরের পর থেকে ব্রিটেনের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা দেখা গেছে। গত কয়েক বছর ধরে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থায় এমন কিছু বড় ধরণের সংকট তৈরি হয়েছে, যা দেখে অনেক বিশ্লেষকই একে একটি “ভাঙা” বা “শাসনকষ্টে ভোগা” রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করছেন।

এ বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট রাফায়েল বেহর লেখা অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে জনপ্রশাসনের পাঠকদের জন্য।

রাফায়েল বেহর মতে, ব্রিটেন শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়েছে-এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতার পেয়ালাটি এখন এক অদ্ভুত বিষে মাখানো। এই বিষ বড় দ্রুত কাজ করে। এর প্রমাণ হলো গত এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর বিদায়।

১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ভাষণ দেওয়ার দৃশ্যটি এখন এক চেনা প্রথায় পরিণত হয়েছে।

ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীদের গড় মেয়াদকাল ছিল দুই বছরেরও কম। কিয়ার স্টারমারের শাসনের অবসানের জন্য ওই ভোট সরাসরি দায়ী নয়। এই পদের জন্য তার নিজস্ব কিছু ঘাটতি ছিল, যার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোনো সম্পর্ক নেই।

ক্ষমতা হাতে নিয়ে তিনি আসলে কী করতে চান, তা নিয়ে তার নিজের মনেই কোনো স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। নিজেকে আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার যে দাবি ছিল, তিনি বরং তাতে বিরক্ত হতেন।

ব্রেক্সিট-পরবর্তী এই কঠিন সময়ে তার এই দুর্বলতাগুলো আরও নির্মমভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এক দশক ধরে চলা আস্থার সংকটের মুখে তার সীমাবদ্ধতাগুলো আর আড়াল থাকেনি।

ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস (যিনি মাত্র ৪৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন) এবং ঋষি সুনাক-কয়েক বছরের ব্যবধানে একের পর এক প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন দেশটির নীতি নির্ধারণে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি করেছে।

ঘন ঘন সরকার ও নীতি পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অর্থনৈতিক মন্দা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি: ব্রিটেনের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে বেশ নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

ব্রেক্সিটের প্রভাব: ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে যে ধাক্কা লেগেছে, তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

জনসেবামূলক খাতের বিপর্যয়: ব্রিটেনের গর্বের জায়গা ছিল তাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু বর্তমানে এটি চরম সংকটে। বাজেট ঘাটতি, কর্মী সংকট এবং দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকার কারণে রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সেবা, রেল যোগাযোগ এবং অন্যান্য পাবলিক সার্ভিসের কর্মীরা নিয়মিত ধর্মঘট করছেন, যা নাগরিক জীবনকে স্থবির করে দিচ্ছে।

সামাজিক বিভাজন ও অভিবাসন বিতর্ক: অভিবাসন নীতি এবং শরণার্থী সংকট নিয়ে ব্রিটেনের সমাজ ও রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত। একদিকে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে দক্ষ কর্মীর অভাব, অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর রাজনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সরকার কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না। এটি সামাজিক উত্তেজনাও বাড়িয়ে তুলছে।

তবে এটি কি আসলেই “শাসনের অযোগ্য”: রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, একে পুরোপুরি “শাসনের অযোগ্য” বলা ঠিক হবে না। ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা) এখনো বেশ শক্তিশালী। সেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, কোনো সামরিক অভ্যুত্থান বা গৃহযুদ্ধ ছাড়াই।

ব্রিটেন বর্তমানে একটি গভীর কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের শাসনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে তুলছে। একে “শাসনের অযোগ্য” বলার চেয়ে “শাসন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে” বলাই হয়তো বেশি যুক্তিযুক্ত। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যদি এই মৌলিক সমস্যাগুলো (অর্থনীতি, স্বাস্থ্যখাত ও সামাজিক ঐক্য) সংস্কার করতে না পারে, তবে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

জনপ্রশাসন/কেএ/২৬/০৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *