তিন ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল বাজার: রপ্তানি আয়ের নতুন ‘অস্ত্র’ কি বাংলাদেশ!

বিশ্ববাজারে এখন কেবল পণ্যের গুণমানই যথেষ্ট নয়, বরং সেই পণ্যটি কোন প্রক্রিয়ায় বা কোন নীতি মেনে তৈরি হয়েছে—সেটির ওপর নির্ভর করছে তার গ্রহণযোগ্যতা।

গত কয়েক দশকে ‘হালাল’ শব্দটি কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলারের এই বিশাল হালাল বাজারে বাংলাদেশ এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান তৈরির স্বপ্ন দেখছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক যৌথ উদ্যোগ এবং হালাল শিল্পকে কেন্দ্র করে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা—সব মিলিয়ে এটি পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘হালাল ইন্ডাস্ট্রি’।

খাদ্য ছাপিয়ে বিস্তৃত জীবনধারা: অনেকেই হালাল শিল্পকে কেবল ‘মাংস বা খাদ্যদ্রব্য’ হিসেবে ভুল করেন। তবে বিশ্ববাজারে এই শিল্পের পরিধি ব্যাপক। এর মধ্যে রয়েছে- হালাল উপাদানে তৈরি ওষুধ, বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান মার্জিত পোশাকের চাহিদা, শরীয়াহ-ভিত্তিক বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং সেবা, পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে হালাল মান নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, এটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন শিল্প নয়, বরং একটি সমন্বিত ইকো-সিস্টেম।

সম্ভাবনার বিপরীতে ‘সনদ’ সংকট: বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ার সুবাদে হালাল পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানিতে আমাদের সহজাত সুবিধা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সার্টিফিকেশন’ বা সনদ প্রদান পদ্ধতি। বর্তমানে বিএসটিআই এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন—উভয়ই সনদ দিলেও এর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়েছে।

বিএমসিসিআই-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে বছরে কয়েক হাজার কোটি ডলারের হালাল খাদ্য আমদানি হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি ও শক্তিশালী সার্টিফিকেশন সিস্টেম না থাকায়, বাংলাদেশ সেই বাজারের বড় একটি অংশ এখনো ধরতে পারছে না। মালয়েশিয়ার মতো রোল মডেল দেশের সহায়তা নিয়ে যদি বাংলাদেশ একটি কেন্দ্রীয় ও বিশ্বস্ত ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তবেই এই বাজার উন্মুক্ত হবে।

কেন এটি আমাদের জন্য ‘গেমচেঞ্জার’: বাংলাদেশে বর্তমানে হালাল পণ্য রপ্তানি মূলত কৃষিভিত্তিক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যদি হালাল হোটেল ইন্ডাস্ট্রি, মেডিকেল ট্যুরিজম এবং হালাল কসমেটিকস খাতের উন্নয়ন করা যায়, তবে এটি কেবল রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না, বরং কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি একটি ‘হালাল অর্থনৈতিক জোন’ গড়ে তুলতে পারে, তবে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

শুধু নীতিমালায় হবে না: ২০২৩ সালের হালাল সনদ নীতিমালা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, এর বাস্তবায়ন জরুরি। আগামী মার্চ মাসে পরিকল্পিত হালাল শিল্প সম্মেলনটি হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন মাইলফলক। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য আসবে তখনই, যখন উৎপাদন থেকে শুরু করে লজিস্টিকস—প্রতিটি পর্যায়ে আমরা আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারব।

মালয়েশিয়া যদি ৪০ বছরের প্রচেষ্টায় হালাল শিল্পের বিশ্বনেতা হতে পারে, তবে বাংলাদেশের জন্য তা অসম্ভব কিছু নয়। প্রয়োজন কেবল রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা এবং শিল্পের আধুনিকায়নে সঠিক বিনিয়োগ।

জনপ্রশাসন/কেএ/২ জুলাই, ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *