দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ ও সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিল ‘গুম’। ভোরের আলো ফোটার আগেই কোনো এক অদৃশ্য শক্তি কাউকে তুলে নিয়ে যেত, যার হদিস মিলত না বছরের পর বছর। এই ভীতিকর সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে এবং নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে অবশেষে এক কঠোর আইনি কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। অতীতের অস্পষ্টতা কাটিয়ে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
গুমের কালান্তক ১৫ বছর: ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের সরকারের পতনের পর যে গুম তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তাদের প্রতিবেদন ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। কমিশন জানিয়েছে, গত ১৫ বছরে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের ৩১২ জন, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ৭৪৭ জনসহ বহু সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। যাদের একটি বিশাল অংশ আর কখনো ফিরে আসেননি। এই খসড়া আইনটি প্রণয়ন হলে অতীতের এই গুমের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসবে।
আইনি লড়াইয়ে গুমের বিচার: নতুন এই খসড়ায় গুমকে আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ রাখা হয়নি। বরং সরকারি সংস্থার পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক গুমের ঘটনাগুলোর বিচারের ভার দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) ওপর। বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে বিচার প্রক্রিয়া যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি অপরাধীদের জন্য তৈরি হবে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা—যার সর্বোচ্চ দণ্ড হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া সর্বনিম্ন শাস্তি হিসেবে ১০ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অনিশ্চয়তার অবসান, ‘গুমের সনদ’: নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারকে যে অমানবিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে হয়, তা লাঘব করতে নতুন আইনে যুক্ত করা হয়েছে ‘গুমের সনদ’-এর বিধান। কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকলে তাঁর পরিবার আদালতের থেকে এই বিশেষ সনদ নিতে পারবে। এর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তির মতোই উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানা, ব্যাংকিং কার্যক্রমসহ সব ধরনের আইনি জটিলতা নিরসন করতে পারবে। এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক হাহাকারের একটি আইনি মলম হিসেবে কাজ করবে।
আইন ও শাস্তির কঠোর মাত্রা: নতুন প্রস্তাবিত খসড়া আইনে গুমের পরিধিকে অত্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। এতে শুধু গুম নয়, বরং গুমের কারণে মৃত্যু, আলামত ধ্বংস করা, গোপন আটককেন্দ্র তৈরি করা এবং এই ধরনের অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি প্রথমবারের মতো সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে, যা অতীতের অস্পষ্টতাকে দূর করবে।
বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে এতে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা যুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের জন্য ৯০ দিন এবং প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন—অর্থাৎ মোট ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে। একইভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য ১২০ দিনের সময়সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে। যদি এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হয়, তবে আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। এই ব্যবস্থা বিচার বিভাগীয় জবাবদিহিতার এক নতুন নজির স্থাপন করবে।
‘গুমের সনদ’: দীর্ঘদিনের হাহাকারের আইনি প্রতিকার: গুমের শিকার হওয়া পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয় সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে। নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো হদিস না পাওয়ায় তারা না মৃত, না জীবিত—এই মধ্যবর্তী অবস্থায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির দখল বা ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা অসহায় হয়ে পড়ে। নতুন এই খসড়ায় এর সমাধানে অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ‘গুমের সনদ’ প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি টানা পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকলে তাঁর পরিবার আদালতের মাধ্যমে এই সনদ নিতে পারবে। এটি পাওয়ার পর নিখোঁজ ব্যক্তিকে আইনিভাবে মৃত বা অনুপস্থিত ধরে নিয়ে তাঁর উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি বণ্টন, জমি বিক্রয় বা ব্যাংকিং যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক হাহাকারের একটি বড় আইনি সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
তদন্তের দায়িত্ব ও নিরপেক্ষতা: তদন্ত সংস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার একটি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট কৌশল গ্রহণ করেছে। সরকারি সংস্থার সদস্যরা পরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও বিস্তৃতভাবে গুম সংঘটিত করলে তার তদন্ত করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ গুমের ঘটনার তদন্ত করবে প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তবে এই বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহলে বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, যে বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ রয়েছে, তাদেরই তদন্তের দায়িত্ব দিলে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন। তিনি তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক উভয় খাতের সাবেক নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের যুক্ত করা যেতে পারে। সরকার অবশ্য বলছে, তারা বিষয়টি পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করবে।
উপসংহার: আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিদেশি মিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মতামতের ভিত্তিতে খসড়াটি চূড়ান্ত রূপ পাবে। এটি কেবল একটি আইন নয়, বরং একটি রাষ্ট্র হিসেবে মানবিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার। গুমের কবলে পড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্বজনরা কি শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাবেন? নাকি এটিও কেবল খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে? প্রশ্নটি এখন সব মহলে। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই আইন রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো সদস্যকে আর কখনোই ক্ষমতার দম্ভে নাগরিকের অস্তিত্ব মুছে ফেলার ছাড়পত্র দেবে না।
জনপ্রশাসন/ কেএ/ জেডআরসি/ ০৪ জুলাই ২০২৬
