১০ লাখ বানভাসির মাথাপিছু বরাদ্দ ২৮ টাকা, ৩ কেজি চাল!

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকান (৬০)। সম্প্রতি তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেলেও তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা সম্ভব হয়নি। কারণ, পুরো কবরস্থানই তখন কোমরসমান পানির নিচে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তাঁর মরদেহ ভেলায় তুলে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে নিয়ে যান। এরপর অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের একটি স্থানে গোসল ও জানাজার ব্যবস্থা করে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের খাসজমিতে তাঁকে দাফন করতে হয়।

আবার, বন্যায় ভেঙে যাচ্ছে সন্তানের কবর। নিরূপায় বাবা পানির প্রবল স্রোতে বিপরীতে নিজের শরীর দিয়ে রক্ষা করতে চাইছেন সেই কবর। বন্যা কবলিত এলাকায় এমন সংখ্য নির্মম, অসহায় চিত্রে দিখা মিলছে সংবাদ প্রতিবেদন বা সমাজিক মাধ্যমে। যে চিত্রের ভয়াবতা মাপা যাবে না কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা।

এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। বর্তমানে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন।

সরকারি বিভিন্ন সূত্র বলছে, নগদ অর্থ ও চালের পাশাপাশি শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।

বাড়ছে মানবিক সংকট, পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জে সরকার
এখন পর্যন্ত দেশের সাত জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখের বেশি মানুষ। পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে প্রাণ গেছে অন্তত ৫১ জনের। দুই লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দি। হাজারো মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, ফসলি জমি পানির নিচে, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এবং জীবিকার পথ কার্যত বন্ধ।

এমন বাস্তবতায় দুর্গত মানুষের জন্য সরকার গত ছয় দিনে নগদ অর্থ বরাদ্দ করেছে মাত্র ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সরকারি হিসাবেরই এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের মাথাপিছু পড়ছে মাত্র ২৮ টাকা। একই সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল, যা ব্যক্তি হিসেবে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি।

অর্থনীতিবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রাথমিক সহায়তা হলেও যে পরিসরের মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, সেখানে এই বরাদ্দ খুবই নগন্য। এটা দিয়ে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনের যে বৃহৎ চাহিদা তৈরি হয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বড় আঘাত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে
চট্টগ্রামেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ পরিবার। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর অনেক এলাকায় এখনো ঘরের ভেতর পানি। বিশুদ্ধ পানির উৎস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও মাতামুহুরী এলাকার বহু মানুষ এখনো নৌকাকে একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে খাদ্যসংকট ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ছে।

পানি নামছে, সামনে পুনর্বাসনের কঠিন লড়াই
বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। কিন্তু পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে এসেছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। হাজার হাজার ঘর কাদায় ভরে গেছে। শত শত কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সেতু ভেসে গেছে, কোথাও পাহাড়ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত, জুমচাষ ও মাছের খামার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু কৃষক বছরের পুরো বিনিয়োগ হারিয়ে এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে। অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। ফলে উদ্ধারপর্ব শেষ হওয়ার আগেই পুনর্বাসনের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে চাপ
এই বন্যা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, শিল্প উৎপাদন হ্রাস এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপ মোকাবিলা করছে। কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা খাদ্য সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়েছেন। ফলে শুধু ত্রাণ নয়, কর্মসংস্থান, কৃষি পুনর্বাসন, ক্ষুদ্রঋণ পুনর্গঠন এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

ত্রাণের চেয়ে বড় প্রশ্ন পুনর্বাসন
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথাপিছু ২৮ টাকার নগদ বরাদ্দ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাৎক্ষণিক ত্রাণ প্রয়োজন হলেও এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা।
কারণ বন্যার পানি কয়েক দিনের মধ্যে নেমে যেতে পারে, কিন্তু ভেঙে যাওয়া ঘর, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা এবং ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের লাগবে মাসের পর মাস, কোথাও কোথাও হয়তো বছরেরও বেশি সময়।

বাংলাদেশ অতীতেও বহু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেছে। কিন্তু এবারের বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিল—দুর্যোগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নয়; বরং তাদের পাশে রাষ্ট্র কত দ্রুত, কত কার্যকর এবং কতটা পর্যাপ্তভাবে দাঁড়াতে পারছে।

পার্বত্য জেলায় শুরু পুনর্বাসনের কঠিন লড়াই
বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অনেক জায়গায় পানি কমতে শুরু করেছে। ফলে, এখন সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। বান্দরবানে বিভিন্ন সড়কে পাহাড়ধসের মাটি জমে থাকায় যান চলাচল এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। শীলক খালের বেইলি সেতু ভেসে যাওয়ায় বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কে যোগাযোগ ব্যাহত রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ ফিরতে শুরু করলেও কাদা, বর্জ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি নিয়ে নতুন সংগ্রাম শুরু হয়েছে।

রাঙামাটিতে বরকল, বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় কৃষিজমি, আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও জুমচাষ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় এখনো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় পানি নেমে গেলেও সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষতি পুনর্বাসন কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে।

আরও কয়েক জেলায় বন্যার বিস্তার
বন্যার প্রভাব এখন চট্টগ্রাম অঞ্চল ছাড়িয়ে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। হবিগঞ্জে ছয় হাজারের বেশি পরিবার এবং মৌলভীবাজারে সাত হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি।

সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। কুড়িগ্রামে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে, আর যশোরের কেশবপুরে দুই শতাধিক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

পানি কমলেও শেষ হয়নি সংকট
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, কয়েক এলাকায় ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। তবে মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি দুর্বল হয়নি এবং নতুন করে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর শুধু উদ্ধার নয়; বরং নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবিকা পুনর্গঠন। কারণ বন্যার পানি নেমে গেলেই লাখো পরিবারের সামনে শুরু এসে হাজির হবে নতুন এক সংগ্রাম—ঘর পুনর্নির্মাণ, ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে সরকার কতটা এগিয়ে আসবে তার উপরই নির্ভর করছে এই মানুষগুলোর ঘুরে দাঁড়ানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *