পাহাড় ধস ও বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম-সিলেট, অর্ধশতাধিক প্রাণহানি

দেশের আকাশে এখন ভয়ঙ্কর দুর্যোগের ঘনঘটা। আকাশ ভেঙে নামছে বৃষ্টি, সাথে তীব্র বজ্রপাত। ঝড়ো হাওয়া আর টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে কাঁপছে পাহাড়, ফুলে ফেঁপে উঠছে নদী। ঢলের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে নগর থেকে গ্রামাঞ্চল।

পাহাড় ধস ও প্লাবনে এখন পর্যন্ত প্রাণহানি ছাড়িয়েছে অর্ধশতাধিক। প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর আর সর্বনাশী রূপে আতঙ্কিত দেশের মানুষ। এর মধ্যে আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি আরও ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে।

পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ যে, লাশ দাফন করতে না পেরে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে গেছে দুই অবুঝ শিশু। মানুষের এই অসহায়ত্ব ও করুণ আহাজারির ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল। চারদিকে পানিবন্দী লাখো মানুষের হাহাকার আর বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে কক্সবাজারেই মারা গেছেন ২৮ জন, যাদের ১৩ জন রোহিঙ্গা রয়েছেন। চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। থমকে গেছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে ভিড়। পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো পৌঁছায়নি প্রয়োজনীয় সহায়তা।

উজানের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার কবলে সিলেট অঞ্চলও। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তারমধ্যে মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মনু নদের বাঁধ ভেঙে জেলার রাজনগর উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলের মাঠ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম,মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের মোট ৫৮টি উপজেলা বন্যা কবলিত দুর্গত মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ১ হাজার ২০০টি আশ্রয় কেন্দ্র, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।

আবহাওয়া অধিদপ্তেরর তথ্যমতে, বৃষ্টিপাতের ভয়াবহতা এবার অতীতের অনেক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণের মাত্র এক সপ্তাহে চট্টগ্রামে রেকর্ড হয়েছে ১১শ ৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এর মধ্যে একদিনেই সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরেছে।

আবহাওয়াবিদেরা জানাচ্ছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প ধেয়ে আসে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলোতে বাধা পেয়ে সেই মেঘ অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপােত রূপ নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন, ‌‌‘ক্লাউড বার্স্ট’ বা মেঘ বিস্ফোরণ। আর তাতেই পাহাড় ধসে এবং আকস্মিক ঢলে এই বিপর্যয় নেমে আসে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কুশিয়ারা, মনু ও সোমেশ্বরী নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

এদিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। ঘরবাড়ি হারানো সর্বস্বান্ত মানুষগুলো এখন একটু খাবার আর বিশুদ্ধ পানির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে শঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে বানভাসি লাখো মানুষের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *