প্রবৃদ্ধির কাগজ-কলমে বন্দি অর্থনীতি: সংস্কারের কণ্টকাকীর্ণ পথে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন এক জটিল ও অভূতপূর্ব নীতিগত ভারসাম্যের মুখোমুখি। প্রবৃদ্ধির বড় বড় পরিসংখ্যান আর আশাবাদী বাজেট ঘোষণা নয়—অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি যে বিশ্বাসযোগ্যতা, উৎপাদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, সেলিম রায়হানের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সেই সত্যই নতুন করে সামনে এসেছে।

এক নজরে মূল সংকট

জিডিপির টানাপোড়েন: সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫%, অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ৩.৫% থেকে ৩.৯%।

ব্যাংক খাতের ক্ষত: ৩০.৬% খেলাপির পাহাড় ও বেসরকারি খাতে মাত্র ৬% ঋণ প্রবৃদ্ধি।

মূল্যস্ফীতির থাবা: দারিদ্র্যসীমা বেড়ে ২১.৪%; থমকে গেছে খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা।

রাজস্ব সংকট: কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা বৈশ্বিক স্তরে অন্যতম সর্বনিম্ন।

পূর্বাভাসের সমীকরণ: প্রত্যাশা বনাম নির্মম বাস্তবতা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করলেও আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফ (IMF) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে মাত্র ৩.৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচও (Fitch) সতর্ক করেছে যে, কাঠামোগত সংস্কার না হলে দীর্ঘমেয়াদে এ গতি আরও থমকে যাবে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এই আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং তা অর্থনীতিতে আস্থার সংকটের এক স্পষ্ট বার্তা।

নীতিগত দ্বিমুখী সংকট: মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের ফাঁদ

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি। চাহিদা কমানো ও টাকার অবমূল্যায়ন রোধ করতে গিয়ে ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানো হয়েছে, যা নতুন বিনিয়োগের পথ রুখে দিচ্ছে।

প্রবৃদ্ধি মন্থর ও কর্মসংস্থান সংকুচিত

জীবনযাত্রার চাপ: সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি কমায় ভোগ ব্যয় কমেছে। ফলে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭% থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪%-এ পৌঁছেছে।

ফিচের পূর্বাভাস: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯% ছুঁইছুঁই থাকবে, যা সরকারের ৭.৫% লক্ষ্যমাত্রাকে পেছনে ফেলে দেবে।

ব্যাংকিং খাতের ভগ্নদশা: ঋণখেলাপির মহোৎসব

বাংলাদেশ অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এখন সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নমনীয়তার চূড়ান্ত পরিণতি এখন দৃশ্যমান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে—যা যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক মারাত্মক বিপজ্জনক সংকেত।

এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যবস্থায়। আমানতকারীরা কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে রাখলেও তা উৎপাদনশীল কিংবা প্রতিশ্রুতিশীল ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ শতাংশে, যা ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন।

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আস্কারা ও মূলধন সংকট

প্রকৃত উদ্যোক্তারা যখন কার্যকরী মূলধনের জন্য ব্যাংকগুলোতে ধর্ণা দিচ্ছেন এবং চড়া সুদের হারের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন প্রভাবশালী ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীরা বারবার পুনঃতফসিলিকরণ ও বিশেষ সুবিধা পেয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে ব্যাংকগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র তারল্য ও মূলধন ঘাটতি। দুর্বল পরিচালন পর্ষদ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংকিং খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও আজ তলানিতে।

এ বিষয়েঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেছেন, ব্যাংক খাতকে এই খাদের কিনারা থেকে তুলতে হলে নিছক ব্যাংক একীভূতকরণ (Merger) বা নাম পরিবর্তনের মতো সাময়িক প্রলেপ দিলে চলবে না। বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পরিচালনগত স্বাধীনতা দিতে হবে। পাশাপাশি, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আর কোনো ছাড় না দিয়ে স্বচ্ছ সম্পদ মূল্যায়ন, শক্ত প্রভিশনিং এবং প্রয়োজনে খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে আমূল পরিবর্তনের শর্তে পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, ব্যাংকিং খাতের এই ব্যর্থতার দায় দিনশেষে দেশের সাধারণ করদাতা ও দায়িত্বশীল ঋণগ্রহীতাদের ওপরেই এসে পড়বে।

রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা ও বহিস্থ খাতের নির্ভরতা

বিশ্বের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ (যা বর্তমানে ৭% এর নিচে)। নতুন বাজেটে রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অবকাঠামো ও মানবসম্পদ খাতে ব্যয় ছাঁটাই করে সেই ঘাটতি মেটানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স বহিস্থ খাতকে কিছুটা অক্সিজেন দিলেও, এককভাবে পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা এবং এফডিআই (FDI)-এর অভাব দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকির কারণ।

উত্তরণের দিশা: দুই বছর মেয়াদী পুনরুদ্ধার রোডম্যাপ

অধ্যাপক সেলিম রায়হানের মতে, অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পরিমাপযোগ্য ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকারি খরচের কঠোর নিরীক্ষা করা। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সুবিধা বন্ধ করা ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানতের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সাধারণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বড় কর ফাঁকিদাতা ও বিত্তশালীদের করের আওতায় আনা এবং মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সামলাতে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রত্যক্ষ সহায়তা বাড়ানো।

পুরনো ধারার প্রবৃদ্ধির মডেল—যার ভিত্তি ছিল সস্তা শ্রম, দুর্বল ব্যাংকিং শৃঙ্খলা ও স্বল্প কর—তা আজ তার চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশকে ৬ বা ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে হলে কাগুজে লক্ষ্যমাত্রা বাদ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রতিযোগিতা ও আইনি শাসনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রবৃদ্ধি কোনো রাজনৈতিক ঘোষণার বিষয় নয়; এটি অর্জন করতে হয় বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংস্কারের শক্তিতে।

জনপ্রশাসন/কেএ/২৪ জুলাই ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *